দৃষ্টিকোণ-১ – শামসুর রহমান এর দৃষ্টিকোণ সিরিজের প্রথম পর্ব।

দৃষ্টিকোণ-১

‘অই পোলা, প্যান্টতো দেখি খুইলা পইড়া যায়। হাঃহাঃ’
ছেলেটা টিটকারিতে কান দেয়না। শুধু সাইজে বড় প্যান্টটার বেল্টের জায়গায় লাগানো দঁড়িটাতে একটা বড় গিঁট দেয়। পাঁচ বছরের এই জীবনটাতে পদে পদে লাঞ্চনা পেতে পেতে সে অভ্যস্ত।

 

‘কিরে, ফড়িং ধরতে যাবি?’ -সমবয়সীদের ডাকে ছেলেটা ওদের পিছু পিছু চলে। বিশাল সবুজ মাঠে গিয়ে দেখে সবুজ লম্বা ঘাসগুলো ওর কোমড় ছুঁয়েছে। ওর বন্ধুরা যখন ফড়িং ধরায় ব্যস্ত, ও তখন ঘাসবনে সূর্যের সাথে লুকোচুরি খেলে।

 

‘এই ফড়িংটা রাখ, আমি এইটার ল্যাঞ্জায় সূতা বাইন্ধা উড়াই।’ -বলে নেতাগোছের একটা ছেলে ওর হাতে কতগুলো ফড়িং ধরিয়ে দেয়। ও যখন মুগ্ধ হয়ে ফড়িংগুলোর পাখার কারুকার্য দেখে, ওরা তখন একটা ফড়িংএর লেজে সূতা বেঁধে ছেড়ে দেয়। ফড়িংটা উড়ে যখনই সামনে যেতে চায়, তখনই সূতায় টান পড়ে। ছেলেটা বিষন্ন হয়ে ভাবে, ওর জীবনের সূতায় টান পড়েই আছে।
কি ভেবে ও হাতের ফড়িংগুলো ছেড়ে দেয়। একটুপরে ফড়িংগুলো ছেড়ে দেয়ার কারণে তাকে শাস্তি পেতে হবে জেনেও সে ফড়িংদের ওড়াওড়ি দেখে।

 

ছেলেটা স্বচ্ছ পানির পুকুরটার কাছে ফিরে আসে। চড় খাওয়া গাল লাল হয়ে আছে। পানিতে নেমে ছেলেটা মুখে পানি দেয়।
আরে!!! শোল মাছটা আজ আবার এসেছে। যখনই ও এখানে আসে, শোল মাছটাকে ভেসে ভেসে বিষন্ন দৃষ্টিতে আকাশের দিকে চেয়ে থাকতে দেখে। প্রথম প্রথম মাছটা ওকে ভয় পেলেও এখন আর পায়না। বলতে গেলে এখন ওকে পাত্তাই দেয়না আর।

 

ছেলেটা দেখে হলুদ রঙএর বিকেলে সমবয়সীদের ঘুড়ি ওড়ানো। নীল আকাশে লাল,নীল,বেগুনী রঙের ঘুড়ি। কোনও কোনওটা হঠাত গোত্তা খেয়ে নিচে নামে। কোনওটা আবার সূতা ছিড়ে অজানার দিকে যেতে থাকে।

 

জীবনের সূতাও কি ঘুড়ির সূতার মতো এত নরম? পাখি বাসা ছেড়ে চলে যায়, কিন্তু পাখির পালক থেকে যায়। ও কি পারবে পৃথিবীতে ওর পালক রেখে যেতে?
ঘুমানোর আগে পাঁচ বছরের ছেলেটার মাথায় এসব চিন্তা খেলা করে।
ছেলেটা একটা ইটে মাথা রেখে ঘুমিয়ে স্বপ্নে সাদা আকাশে কালো রঙের ঘুড়ি ওড়ায়।।

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.