মায়ার বাধন ৫ম পর্ব

আমি ভাবতে ভাবতে খাবারটা মুখে দিলাম কিন্তু গিলতে পারছি না গলায় যেন আটকে গেলো, অনেক চেষ্টা করেও গলা দিয়ে খাবারটা নামাতে পারলাম না, শেষে এক ঢোক পানি দিয়ে গিলে নিয়ে খাবারটা না খেয়েই উঠে গেলাম। আম্মা অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো “কি রে এই বললি ক্ষুধায় দুনিয়া খেয়ে ফেলবি আর এখন না খেয়েই উঠে যাচ্ছিস? কি হয়েছে তোর কিছু তো বলছিসও না।
আমি আম্মাকে বললাম ভালো লাগছে না মা পরে খাবো বলে রুমে এসে বিছানায় শুয়ে গেলাম। আম্মা খাবারটা ঢাকা দিয়ে এসে আমার কপালে হাত দিয়ে দেখে বললো কই জ্বরটর তো কিছু হয়নি তাহলে কি হলো তোর? রাস্তায় কি হয়েছিলো বলছিলি খারাপ কিছু হয়নি তো? কি হয়েছে মা আমাকে খুলে বল, আমি তোর মা আমার কাছে কিছু লুকাস না মা বল।
বুঝতে পারলাম আম্মার অন্যরকম চিন্তা আর ভয় মাথায় কাজ করতে শুরু করেছে তাই এখন না বললেই নয়। বললাম আম্মা তেমন ভয়ের কিছু নয়, আসলে রাস্তায় এই এই ঘটনা ঘটেছে বলে সংক্ষেপে সবটা জানালাম।
আম্মা শুনেও আহা ইস্ এমন শব্দে নিজের কষ্ট আর পরীর প্রতি মায়াটা প্রকাশ করলো। একটু বকার স্বরে বললো, “তাহলে মানুষ মোবাইল নাম্বারটা নিয়ে আসে না? আজকাল মোবাইল নাম্বারটা নেওয়া তো ব্যাপার না কেউ কিছু মনেও করে না চাইলে। তাহলে মনে করে নাম্বারটা নিবি না? নিলে তো এখন একটু কল দিয়ে খোঁজ নিতে পারতি। এখন মা মরা কচি মেয়েটা যদি তোর আশায় না খেয়ে বসে থাকে? এতটুকু বাচ্চার সাথে কেউ এমন করে, শুনেই তো মায়া লাগছে দেখে কি করে তুই ওর সাথে এমন করতে পারলি? অন্তত মোবাইল নাম্বারটা নিলেও তো মাঝে মাঝে কথা বলে মেয়েটাকে একটু সান্ত্বনা দিতে পারতি।
আম্মার কথা গুলো আমাকে আরও কষ্ট দিচ্ছে, কেন জানি শুনতে অসহ্য লাগছে, কাটা ঘাঁয়ে যেন নুনের ছিটে মনে হচ্ছে। তাই একটু কড়া সুরে বললাম আম্মা এখন যান তো আমি একটু চোখ বন্ধ করে থাকবো, সারাদিন জার্নি করে আর বকবক করতে ইচ্ছে করছে না।
আম্মা চলে গেলো। আমি চোখ বন্ধ করতেই পরীর মুখটা শুধু ভেসে উঠছে আর ওর কথা গুলো কানে বাঁজছে। নিজের প্রতি নিজের খুব রাগ হচ্ছে। মনে মনে ভাবছি, সত্যি তো কেন মোবাইল নাম্বারটা চেয়ে নিলাম না, কথা না হয় নাই বলতাম তবু নাম্বারটা তো নিতে পারতাম। আর ভদ্রলোকটাই বা কেমন উনিও তো আমার নাম্বারটা চেয়ে নিতে পারতো নিজের মেয়ের জন্য। আবার মনে হলো না হয়তো ভদ্রলোকের মনে হলেও চাইতে পারেনি লজ্জায় কারন একটা অপরিচিত মেয়ের সাথে এমনি যা ঘটলো তারপর মোবাইল নাম্বারটা চেয়ে নেওয়া কোন ভদ্র সভ্য মানুষের দ্বারা সম্ভব নয়। ভুলটা আমারই, আমারই চেয়ে নেওয়া উচিত ছিলো।
এসব নানা কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি বুঝতে পারিনি।
আম্মা রাতে খাবারের জন্য ডাকতে আসছে, বলছে মা একটু উঠে খেয়ে আবার ঘুমা সারাদিন তো কিছুই খাসনি।
আমি ঘুমে ঘুমেই আম্মাকে বললাম বিরক্ত করেন না তো আমি এখন খাবো না ঘুমাতে দেন। আমার ঝাঁঝালো কন্ঠ শুনে আম্মা বুঝে গেলো এখন ডেকে কাজ হবে না বরং আমি আরও রেগে যাবো। তাই আর না ডেকে চলে গেলো।
আমি সকালে ঘুম থেকে উঠেই তাড়াতাড়ি তৈরী হয়ে হালকা একটু খেয়ে অফিসে রওনা হলাম। পরীর কথা আর মনে নেই। অফিসে গিয়ে কাজের মধ্যে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। হঠাৎ একটা মহিলা আসলো তার ছোট বাচ্চাকে নিয়ে, বাচ্চাটাকে দেখেই আমার আবার পরীর কথা মনে পড়ে গেলো। মনে হলো মেয়েটা কি করছে? খেয়েছে তো নাকি না খেয়ে জিদ করে বসে আছে? ওর বাবার নিশ্চয় মেয়েকে বোঝাতে খুব কষ্ট হচ্ছে? না না! এতক্ষনে হয়তো ভুলে গেছে আমাকে, ছোট বাচ্চা ওরা কি এতকিছু মনে রাখতে পারে, একটা খেলনা পেলেই সব ভুলে যায়, নিশ্চয় আমার কথাও ভুলে গেছে। যাকগে এসব ভেবে কাজ নেই। আমি মহিলার সাথে কথা বলে বিদায় দিলাম।
বাড়ি আসার পথে রাস্তাতেও কয়েকবার মনে হলো পরীর কথা। বাড়ি এসেও মনে হলো খেতে বসে, ঘুমাতে গিয়ে। ওর মাম্মাম ডাকটা কিছুতেই ভুলতে পারছিনা, খুব মায়া ছিলো ডাকটার মধ্যে, বারবার মনে হচ্ছে মাম্মাম তুমি যখনি যাবে যখনি আসবে, তাত্তাড়ি এসো কিন্তু, ওর প্রতিটা কথাই কানে প্রতিধ্বনির মত বাঁজছে সবসময়। জানিনা একটা অপরিচিত বাচ্চার জন্য কেন আমার মনের মধ্যে এমন অস্থির লাগছে মাঝে মাঝেই, বেশি সময়ের তো পরিচয় নয় মাত্র সামান্য একটু সময়ের পরিচয়। কেন তাকে ভুলতে পারছি না? কেন এত মায়া হচ্ছে? আমি কি তাহলে মা দের মত আবেগি হয়ে যাচ্ছি? মা দের এসব আবেগ তো আমার সবসময় ফালতু মনে হতো তাহলে আজ আমার কেন এমন হচ্ছে?
নানা প্রশ্নে নিজেই নিজেকে জর্জরিত করে মনের সঙ্গে যুদ্ধে জিততে চাইছি। কিন্তু কিছুতেই জিততে পারছি না। এভাবে দুদিন পার হলেও প্রতি মুহুর্তে বারবার মেয়েটার কথা মনে পড়ছে কিছুতেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারছি না। মাঝে মাঝে চিন্তাও হচ্ছে খুব। জীবনে কি আর কখনো মেয়েটাকে দেখতে পাবো না, ইস্ যদি আর একটা বার দেখতে পেতাম।
ভাবতেই হঠাৎ মনে পড়ে গেলো ভদ্রলোক তো পরিচয় দেওয়ার সময় বলেছিলো সেখানে কাস্টমসে আছে, তাহলে তো কাস্টমসে গিয়ে খোঁজ নিলেই ভদ্রলোক কে পেয়ে যাবো। ইয়েস! পেয়ে গেছি পরীর খোঁজ পাওয়ার উপায়। এবার নিশ্চয় ওকে পাবো। তাই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম কাল অফিসে না গিয়ে পরীর খোঁজে কাস্টমসে যাবো। একবার অন্তত খোঁজ না নিলে কিছুতেই শান্তি পাবো না।
সারা রাতটা পরীর কল্পনায় আর কখন সকাল হবে পরীর দেখা পাবো সেই আনন্দে ভালো ঘুমাতে পারলাম না। ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠেই আমি তাড়াতাড়ি তৈরী হয়ে নিলাম। আম্মা দেখেই বলছে কি রে আজ এত সকালেই রেডি হচ্ছিস কোন জরুরী মিটিং আছে নাকি কোথাও যেতে হবে?
আমি বললাম আম্মা আমি পরীর খোঁজ নিতে যাচ্ছি। আম্মা চমকে উঠে বললো কি? পরীর ঠিকানা পেয়েছিস? কোথায় পেলি কার কাছে পেলি?
ও মা আমি পরীর ঠিকানা পাইনি, পরীর বাবা তার অফিসের ঠিকানাটা বলেছিলো সেটা মনে পড়েছে, তাই আমি উনার অফিসে যাচ্ছি খোঁজ নিতে। আম্মা বললো, “যা তাহলে আর পরীকে কিন্তু দেখে আসবি আবার না দেখেই দুর থেকে যেন পালিয়ে না আসিস। আর মোবাইল নাম্বারটা নিয়ে আসবি, এবার যেন ভুল না হয়”।
আমি ঠিক আছে বলে তাড়াতাড়ি বের হয়ে গেলাম, মার্কেটে ঢুকে পরীর জন্য একটা টেডিবিয়ার, অনেকগুলো চকোলেট কিনে নিয়ে পরীর বাবার অফিসের উদ্দেশ্য রওনা হলাম।
#চলবে…
♥স্বপ্না’স খেয়াল

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.