মায়ার বাধন ৩য় পর্ব

৩য় পর্ব
আমি গাড়ি থেকে নেমে মুখ গোমরা করে দাঁড়িয়ে আছি, এতটাই রাগ হচ্ছে যে কিছু বলার মত ধর্য্যও হারিয়ে ফেলেছি। ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আমি জানি আপনার খুব রাগ লাগছে আর লাগাটাই স্বাভাবিক। আপনার জায়গায় যে কেউ হলেই রেগে যেত। কিন্তু বিশ্বাস করুন আমি নিরুপায়, মেয়েটা যে এমন করবে আমি কল্পনাও করতে পারিনি। এর আগে কোনদিন পরী এমন করেনি কাউকে দেখে”।
#আমি- পরী বাচ্চা মানুষ একটা ভুল করতেই পারে কিন্তু আপনি কেন সবাইকে বলে দিলেন না যে আমি আপনাদের কেউ নই? আপনি বললেই তো আর এত ঝামেলা হতো না।
#পরীর বাবা- হ্যা আমি সেটা বলতে পারতাম কিন্তু তাতে কি কোন লাভ হতো? বরং জটিলতা আরও বাড়তো। কেউ বিশ্বাস করতো না আমাদের কথা কারন ৪বছরের একটা বাচ্চা কখনো তার মাকে চিনতে ভুল করতে পারে না। গাড়ির সবাই এমনি ধরে নিয়েছে আমাদের মধ্যে ঝগড়ার জন্য আমরা এসব করছি আর তারপরও যদি বলতাম তখন সবাই আমাকে বলতো পরীর মা কই তাহলে? মা নাই মানে নিশ্চয় পরীকে আমি চুরি করে এনেছি। তখন সবাই মিলে আমাকে গণধোলাই দিয়ে মেরে ফেলতো নয়তো পুলিশে দিতো। আপনিও যে বেঁচে যেতেন তারও কোন নিশ্চয়তা ছিলো না। আপনি কি বলতে চান সেটা করাই উচিত ছিলো আমার?
আমি মনে মনে ভাবছি ভদ্রলোক মন্দ কিছু বলেনি, বুদ্ধি আছে বলা চলে। আসলেই তো যে পরিস্থিতি তৈরী হয়েছিলো আর একটু হলে এমনিতেই গণধোলাই খেতে হতো। যাক গণধোলাই থেকে তো বেঁচে গেছি এখন আর ওটা নিয়ে ভেবে লাভ নাই বরং এই বিচ্ছুটার হাত থেকে কি করে বাঁচা যায় সেই চিন্তা করি। আমি ভদ্রলোক কে বললাম, “তাও ঠিক বলেছেন, আচ্ছা বাদ দিন যা হবার হয়েছে এখন কি করা যায় সেটা বলুন”।
#পরীর বাবা- আমি বুঝতে পারছি আপনার ব্যাপারটা কিন্তু বিশ্বাস করুন আমি নিরুপায়, আমি জানি এখন আপনার একা একা বাড়ি ফিরতেও কষ্ট হবে। আপনি চিন্তা করবেন না আমি আপনাকে গাড়ি করে দিবো। যদি কিছু মনে না করেন একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে এখন একটু বসি চলুন। সেখানে বসে পরীকে একটু স্বাভাবিক করে তারপর বুঝিয়ে দেখি নিশ্চয় কাজ হবে।
#আমি- তাই চলুন তাহলে।
পাশেই একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে আমরা বসলাম। বসেই মনে হলো একটু চোখমুখে পানি দেওয়া জরুরী। এত ঝামেলা, জার্নি আর রাগে মুখ চোখের অবস্থা তো খারাপ তারপর চোখটাও জ্বালা করছে। ভদ্রলোক বুঝতে পারলেন হয়তো বিষয়টা তাই বললেন,
#পরীর বাবা- পরী এবার তো একটু মাম্মামকে ছাড়, মাম্মামের তো কষ্ট হচ্ছে বাবা। তুমি মাম্মামের পাশে চেয়ারে বস, মাম্মাম একটু ফ্রেস হয়ে আসুক।
এতক্ষনে বিচ্ছুটার মুখে যেন কথা ফুটলো, বললো,” না আমিও মাম্মামের সাথে ফ্রেস হতে যাবো”।
ভাবলাম কোন উপায় নেই, পড়েছি মোগলের হাতে খানা খেতে হবে সাথে। সবই কপাল, আমি বললাম, “পরী মা তাহলে একটু নেমে আমার হাতটা ধরে হেটে চলো”।
#পরী- ওকে মাম্মাম চলো।
মনে মনে বলছি যাক কোল থেকে তো নামাতে পেরেছি সেই অনেক, কানে ধরছি আর যদি এই বিপদ ঘাড়ে নিয়েছি তো। দুজন মিলে ওয়াসরুমে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে আসলাম। এবার আর বোকামী করা যাবে না তাই যে কাজই করবো অনেক ভেবে চিন্তে করতে হবে নয়তো এই বিচ্ছুটার হাত থেকে বাঁচা মুশকিল, যেভাবে সুপারগ্লুর মত আটকে আছে। তাই আমি আর আগে বসলাম না যদি বিচ্ছুটা আমার কোলে বসার বায়না ধরে। আমি দাঁড়িয়ে থেকে পরীকে বললাম, “পরী তুমি পাপার পাশের চেয়ারে বস মাম্মাম”।
#পরী- না মাম্মাম আমি তোমার পাশেই বসবো।
#আমি- পরী তুমি পাপার পাশে বসলে মাম্মামকে সামনাসামনি দেখতে পাবে আর মাম্মামও তোমাকে দেখতে পাবে মা। কতদিন মাম্মাম তোমাকে প্রান ভরে দেখেনি বলতো? তুমিও তো মাম্মামকে দেখনি, তোমার কি ইচ্ছে করছে না মাম্মামকে সামনে বসে দেখতে?
#পরী- হ্যা ইচ্ছে করছে তো মাম্মাম। আচ্ছা ঠিক আছে আমি তাহলে পাপার পাশেই বসছি তবে তুমি কিন্তু আমাকে খাইয়ে দিবা আজ। আমি তোমার থেকে খাবো।
#আমি- আচ্ছা ঠিক আছে পরী সোনা আজ আমিই তোমাকে খাইয়ে দেবো।
#পরী- জানো মাম্মাম, আমার বন্ধুদের মাম্মামরা যখন তাদেরকে আদর করে খাইয়ে দিতো তখন আমার খুব ইচ্ছে করতো যদি তুমি থাকতে তাহলে তুমিও আমাকে এমন আদর করে খাইয়ে দিতে।
পরীর কথাগুলো শুনে আমার কেন জানি বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠলো। এতটুকু মনে কতটা কষ্ট লুকানো। মনে মনে ভাবছি ওর মা কোথায়? কিন্তু পরীর সামনে কি এই প্রশ্নটা করা উচিত হবে ভদ্রলোককে? থাক কথার প্রসঙ্গে ভদ্রলোক নিজে থেকেই কিছু বলে কিনা দেখি।
ভদ্রলোক কি খাবেন জানতে চাইলে আমি বললাম শুধু একটা কফি খাবো।
ভদ্রলোক ওয়েটারকে ডেকে দুটো কফি আর পরীর জন্য একটা বার্গার অর্ডার করলেন।
আমি ভাবলাম এই সুযোগে কিছু গল্প করে বিচ্ছুটার মন থেকে ভয়টা দুর করি, আমি যে ওকে ছেড়ে যাবো না সেই বিশ্বাসটা আগে করাতে হবে নয়তো ছাড়া পাওয়া মুশকিল আছে।
#আমি- আচ্ছা পরী বলো তো তুমি মাম্মামকে কি করে চিনতে পারলে?
#পরী- আমি তো আগেই তোমার ছবি দেখেছি, ছবিতে সাদা জামা পড়া ছিল। পাপা বলেছিলো তুমি নাকি আকাশের তারা হয়ে গেছো আর তারাদের নাকি সাদা জামা পড়তে হয়, সেজন্যই তো তারারা দেখতে সাদা হয়। পাপা বলেছিলো তুমি যেকোন দিন আকাশ থেকে খোঁসে পড়লেই আমার সামনে আসবে। তাই আজ তোমাকে সাদা জামা পড়া দেখেই আমি চিনতে পেরেছি যে তুমিই আমার মাম্মাম।
#আমি- পরী মা সাদা জামা তো অনেকেই পড়ে, এর আগে কি তুমি কাউকে সাদা জামা পড়তে দেখনি?
#পরী- দেখেছি মাম্মাম, অনেক দেখেছি কিন্তু সাদা জামা পড়লেই কি আমার মাম্মাম নাকি সবাই? ওরা অন্যদের মাম্মাম।
#আমি- আমিও তো তোমার মাম্মাম নাও হতে পারতাম, আমিও তো অন্যদের মাম্মাম হতে পারতাম তখন?
#পরী- মাম্মাম তুমি অন্য কারো মাম্মাম হতেই পারো না, আমি তোমাকে চিনতে কখনো ভুল করতেই পারি না। আমি তো সবসময় তোমাকে কল্পনা করতাম, স্বপ্নে দেখতাম তাই প্রথম দেখেই চিনে ফেলেছি তুমিই আমার মাম্মাম।
পরীর কথাগুলো শুনে ভদ্রলোক মনটা ভার করে চুপ করে শুধু শুনছেন, মুখে একটা কথাও বলছে না। বোঝা যাচ্ছে মেয়ের কথাগুলো তার হৃদয়ের কোথায় গিয়ে আঘাত হানছে, ভদ্রলোকের মনটা যে চিৎকার করে কেঁদে যাচ্ছে তা আমার বুঝতে বাকি রইলো না কারন আমি পর হয়েও আমার ভেতরটা কেঁদে যাচ্ছে আর উনি তো পরীর বাবা। পরীর কথা শুনে বুঝা গেলো ওর মা নেই, তবে সত্যিকারে কি হয়েছে সেটা পরিষ্কার নয়। বুঝলাম কচি মনে মাকে নিয়ে যে একটা অভাববোধ আর সেই অভাব বোধ থেকে নিজের মনের মধ্যে মাকে নিয়ে কল্পনায় যে ছবি পরী এঁকেছে তার কোথাও হয়তো আমার সাথে মিল পেয়েছে বলেই এই কান্ডটা ঘটিয়েছে। ছোট মানুষ তাই ঠিক মত বুঝিয়ে বলতে পারছে না। মাঝে মাঝে মেয়েটার উপর যতটা বিরক্ত আর রাগ হচ্ছে ঠিক ওর কথা গুলো শুনলে ততটাই মায়া হচ্ছে কষ্ট লাগছে।
ওয়েটার খাবার দিয়ে গেলো, আমি পরীকে বার্গারটা খাইয়ে দিচ্ছি আর মাঝে মাঝে নিজের কফিটায় একটু চুমুক দিচ্ছি। এমন সময় অনেকক্ষন পর ভদ্রলোক মুখ খুললেন। তারপর নিজে থেকেই পরিচয় দিয়ে কথা শুরু করলেন।
#পরীর বাবা- আমি বুঝতে পারছি আপনার মনের মধ্যে আমাদের নিয়ে অনেক প্রশ্ন জমা হয়েছে আর হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমি প্রিতম, আমার বাসা এখান থেকে অল্প কিছুটা দুরেই। আমি এখানে কাস্টমসে আছি। এই মেয়েটাই আমার জীবনের সব। পরী ছোট থাকতেই ওর মা একটা এক্সিডেন্টে আমাদের ছেড়ে চলে যায় তাই আমি কখনো পরীকে এতটুকু কষ্ট পেতে দেই না। জীবনের প্রথম আজ গাড়ীর মধ্যে ওকে এত জোরে ধমক দিলাম। আপনি বিশ্বাস করবেন না এতে আমার কতটা কষ্ট হয়েছে, তবু বাধ্য হয়েছি।
ভদ্রলোকের কথাগুলো শুনে আমার মুখের সব কথা হারিয়ে গেলো, এমন কথা শোনার পর কি উত্তর দেওয়া যায় আমি জানি না, জীবনে কখনো এমন পরিস্থিতিতে পড়িনি আর এমন গল্পেরও স্বাক্ষী হইনি তাই বুঝতে পারলাম না কি বলে ভদ্রলোককে সান্ত্বনা দেবো। শুধু মেয়েটার জন্য কষ্ট হলো, আর ভদ্রলোকের প্রতি সহানুভূতি আর শ্রদ্ধা বেড়ে গেলো। কিছুটা সময় আমি চুপ করে রইলাম কথা গুলো শোনার পর। ভদ্রলোকও আর কোন কথা বলতে পারলেন না।
তারপর আমি বললাম,
আমার নাম প্রিমু, আমার বাসা সামনের স্টপিজ থেকে কিছুটা দুরেই।
#পরীর বাবা- পরী মা তোমার বার্গারটা মাম্মাম খাইয়ে দেওয়ার পর আমি আর তুমি আগে বাড়ি চলে যাবো আর মাম্মামের একটু কাজ আছে সেটা শেষ করেই মাম্মাম বাড়ি চলে আসবে ঠিক আছে বাবা?
#পরী- না আমি মাম্মামের সাথেই বাড়ি যাবো। মাম্মামকে ছাড়া আমি কোথাও যাবো না।
#পরীর বাবা- পরী তুমি তো লক্ষী মেয়ে এমন জিদ করে না মা। পাপা যখন অফিস যাই তুমি কি এমন জিদ করো বলো? করো না তো। তাহলে এখন কেন করছো? মাম্মাম তো তোমাকে পঁচা বলবে। মাম্মামের একটু অফিসে কাজ আছে সেটা সেরেই চলে আসবে মা।
#আমি- পরী বলো তো মাম্মাম তোমার কি কি পছন্দ? মাম্মাম তোমার জন্য সেটা কিনে আনবো? তুমি পাপার সাথে থাকো আমি দৌড়ে গিয়ে আমার লক্ষী মাম্মামটার জন্য এতগুলো চকলেট, আইসক্রিম, ট্রফি কিনে আনবো, সাথে আর কি আনবো বলো তো মা?
#পরী- মাম্মাম আমার কিছু চাই না এগুলো, শুধু তোমাকে চাই, তোমার সাথে থাকতে চাই আমি আর পাপা। তুমি কোথাও যেওনা মাম্মাম আমাদের ছেড়ে। জানো মাম্মাম, তুমি ছিলে না বলে পাপা মাঝে মাঝেই খুব কান্না করতো, আমি তখন পাপার চোখ মুছে দিয়ে বলতাম পাপা কেঁদো না মাম্মাম ঠিক আসবে। দেখেছো তো পাপা আমার কথা ঠিক হলো কিনা? মাম্মাম তো ঠিক এসেছে।
এরপর আমি কি বলবো ভাষা হারিয়ে ফেললাম, চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এলো। আমি চুপ করে রইলাম।
#পরীর বাবা- পরী, মাম্মাম এতদিন পর এসছে তোমার কাছে তাই তোমাকে কিছু গিফট করতে চায় মা, তুমি যদি না নিতে চাও মাম্মাম কতটা কষ্ট পাবে ভাবো, তুমি কি মাম্মামকে কষ্ট দিতে চাও? কষ্ট দিলে মাম্মাম আবার হারিয়ে যাবে আমাদের কাছে থেকে, তুমি কি চাও মাম্মাম আবার হারিয়ে যাক?
#পরী- না পাপা আমি মাম্মামকে একটুও কষ্ট দেবো না। মাম্মাম আমি তোমাকে কখনো কষ্ট দেবো না তবুও তুমি আর হারিয়ে যেওনা প্লিজ। আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি মাম্মাম।
#চলবে..
স্বপ্না’স খেয়াল

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.