স্ত্রীর জন্যে স্বামীর বিসর্জন “রমনীর স্বপ্ন“

একবার এক ভদ্রলোকের সাথে গাড়িতে দেখা হয়েছিলো আমার। লোকটাকে দেখে কেমন চিন্তিত মনে হচ্ছিল। ঘামে ভেজা শরীর,বড় বড় নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। আমাকে বললেন, মা আমি কি আপনার পাশে বসতে পারি? জ্বি…জ্বি বসুন। আমি একটু আড়ষ্ট হয়ে বসলাম। উনার চোখে চোখ পড়তেই দেখলাম, উনি কপালের ঘাম মুছচেন আর একটু লজ্জিত হয়ে হাসছেন। আমি প্রথম দিকে ভদ্রলোকের লজ্জা পাওয়ার কারনটা বুঝতে পারিনি। পরে খেয়াল করে দেখলাম উনার হাতের ব্যাগটা ধুলোয় ভর্তি আর শার্টের হাতাটা অনেক নোংরা। তাছাড়া শার্টের পাঁচটা বোতামের তিনটে বোতাম নেই। ভদ্রলোক এই কারনে সম্ভবত লজ্জা পাচ্ছিলেন। আমি ব্যাগ থেকে পানির বোতলটা এগিয়ে দিয়ে বললাম, এই নেন চাচা একটু পানি খান। আমার হাত থেকে জোরে পানির বোতল নিয়ে ঢক ঢক করে সবটা পানি খেয়ে নিলেন। আমার মনে হচ্ছিলো উনি প্রশান্তি বোধ করছেন এইটুকু পানি খেয়ে। লোকটা বোতলটা ফেলে দিবেন নাকি আমায় দেবেন সংকোচ করছিলো। আমি বুঝতে পেরে বললাম, চাচা বোতলটা হাতে রাখুন স্টেশন আসলে ফেলে দিয়েন। উনি অবাক দৃষ্টিতে আমার তাকিয়ে বললেন, আপনি অনেক ভালো মা। এটা কেন মনে হলো চাচা! মা’গো দেখলে কিছুটা হলেও বুঝা যায় কে, কেমন?পৃথিবীতে কত রকমের মেয়ে মানুষ হয় সবাই তো যার যার মত ভিন্ন। চাচা আপনি কোথায় যাচ্ছেন,আপনাকে খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে আমি কি জানতে পারি? অবশ্য যদি আপনার আপত্তি না থাকে। না….. .না মা কি বলছেন । আমাকে প্রায় প্রতিদিন এই পথ ধরে যেতে হয়। আমার স্ত্রীর খুব শখ শহরে একটা ছোট্ট বাড়ি করার। কিন্তু আমার চাকরীর যে টাকা পাই তা দিয়ে বাড়ি বানানো সম্ভব নয়। অফিস করে তাই প্রতিদিন বড় বাজারে যাই। সেখানে আমার একটা ছোট্ট বইয়ের দোকান আছে। ওখানে একটু বসি আর যেদিন বসতে ভালো লাগেনা সেদিন এই ব্যাগে ভরে কিছু বই নিয়ে আসি। গাড়িতে ঘুরে ঘুরে যে কয়টা বই বিক্রি করি সেই টাকা জমিয়ে রাখি। তাই হন্তদন্ত হয়ে বের হতে হয় আর স্ত্রীর ইচ্ছে পূরন করার জন্যে সবসময় আমার মুখে চিন্তার ছাপ থাকে এ আর কি এমন মা! চাচা আপনি যে এত খাটেন সেটা আপনার স্ত্রী জানেন? না ও জানেনা। ও খুব বেশি চিন্তা করলে অসুস্থ হয়ে যায় তাই ওকে এসবের কিছুই জানাইনি। কিন্তু চাচা আপনার স্ত্রীর জন্যে আপনার এই বিসর্জনের ব্যপারটা জানালে হয়তো উনি আপনাকে আরও বেশি সাহস দিতেন। না মা স্ত্রীর আবদার পূরন করার স্বপ্নে আমি একাই কষ্ট করতে চাই। তাছাড়া আমার স্ত্রীর রক্তের হিমোগ্লোবিন এর পরিমান খুবই কম ওকে মাঝে মাঝে রক্ত দিতে হয়। তাই বাড়তি চিন্তা ওকে আমি কখনই দিতে রাজি নই। চাচা আপনার কথা শুনে মনটা ভরে গেলো। আমি দোয়া করি আপনার স্ত্রীর স্বপ্ন পূরনে আপনার কষ্টটা যেন বৃথা না যায়। কথার মাঝখানেই হেল্পার বললেন, আফা আপনের ইস্টিশন আইয়া পরছে নামেন। তৎক্ষনাৎ, ভদ্রলোকের কাছ থেকে আমি সবগুলো বই কিনে নিলাম। উনি অবশ্য বিক্রি করতে চায়নি। বললেন মা, আপনি আমাকে টাকা দিতে হবেনা। না চাচা যেদিন আপনার সুন্দর বাড়িটি তৈরি হবে সেদিন আপনার বাড়ির সাজানো বুক সেলফ থেকে বিনে পয়সায় বই পড়বো। উনি আর জোর করলেন না আমায়, শুধু মিষ্টি একটা হাসি দিলেন। আমি চাচার থেকে বিদায় নিয়ে নেমে পড়লাম। মাস ছয়েক পর আমি বড় বাজারের ঐ দিকটায় বাসা খুঁজতে গেলাম। বাসাটা আমাদের বন্ধুদের জন্যে। কারন তখন আমরা অনার্সের ভর্তি পরীক্ষার জন্যে অল্প কয়েক মাসের একটা বাসা খুঁজছিলাম। খুঁজতে খুঁজতে আমার নীল রংয়ের একটা বাড়িতে চোখ আটকে গেলো। যার উপরে বড় করে লিখা “রমনীর স্বপ্ন”। কৌতুহল বেড়ে দ্বিগুণ হলো আমার। আমি বাড়ির ভেতরে ঢুকে দরজায় নক করলাম। আমার বয়সী একটা মেয়ে দরজা খুলে বলল, কাকে চাই? বাসা ভাড়া দেওয়া দেয়া হয়? না আপনি ভুল জায়গায় এসেছেন কেন বাহিরে কারো কাছ থেকে শুনেন নি এই বাড়িটা ভাড়া দেয়া হয়না। আমি তো কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করিনি। কেন ভাড়া দেয়া হয়না জানতে পারি কি? আসলে বাবা মায়ের স্বপ্ন পূরন করতে এই বাড়িটি বানিয়েছেন তো সে জন্যে বাবা চায়না পরিবারের বাইরে কেউ এই বাসায় থাকুক। আচ্ছা কষ্ট দিলাম আপনাকে বরং আমি আসি। মেয়েটা দরজাটা বন্ধ করে দিল। আমি কি মনে করে আবার কলিং বেল চাপলাম। মেয়েটা দরজা খুলে…….. আর কিছু বলবেন আপনি? জ্বী, আসলে আপনার বাবা কি বাসায় আমি একটু উনার সাথে দেখা করতে চাই! হুম….কিন্তু বাবাকে চেনেন আপনি? না….মানে….আমার উনার সাথে দেখা করা খুব দরকার। আসুন ভেতরে আসুন…..বসুন আপনি। আমি ড্রয়িং রুমে বসতেই চোখ পড়লো সাজানো বুক সেলফে। হেঁটে হেঁটে বই দেখছি। মেয়েটা বলল, আপু বাবা তো আজ এক মাস বিছানায় শোয়া।উনি আসতে পারবেন না বরং আপনি ভেতরে চলুন। আমি ভেতরের রুমে গিয়ে দেখলাম উনার স্ত্রী পা টিপছে। জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছিল উনার? মেয়েটা বলল, বাবা বাড়িটা কমপ্লিট করার এক মাস পর স্ট্রোক করলো। এখন সব সময়ই বিছানায় থাকতে হয়। বাবা মায়ের স্বপ্নটা পূরন করতে গিয়ে নিজের তৈরি বাড়িতে এখন জিন্দা লাশের মত আছেন। একথা বলতেই মা, মেয়ে কেঁদে দিলেন। ভদ্রলোকের স্ত্রী আমায় বললেন, কিন্তু মা আপনাকে তো চিনলাম না! আমি সব খুলে বললাম। ভদ্রমহিলা সবটা শুনে নিজের দোষ দিয়ে কান্না শুরু করলেন। চাচা তখন মুখে কিছু না বললে ও এ্যা…..এ্যা ……..এ্যা…….শব্দ করছিলেন। আমি উনার কানের কাছে গিয়ে বললাম, চাচা আপনি সুস্থ হয়ে যাবেন আবার। আপনাকে না ফেলে আপনার ভালোবাসার পরিবারটা ভালো থাকবেনা চাচা। আপনাকে যে সুস্থ হতেই হবে চাচা। চাচা চোখের কোণে পানি নিয়ে অনেক কষ্টে হাত রাখলেন আমার মাথায়। আমি এই সফল ব্যক্তিটির ছোঁয়া নিয়ে সুন্দর বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলাম। আর ভবিষ্যতে এরকম একজন স্বপ্ন পুরুষের অবয়ব কল্পনা করে বাসা খুঁজতে লাগলাম।
.
Facebook Post Link
.

Najiur Rahman Shaown

The official Facebook page of Najiur Rahman Shaown
Najiur Rahman Shaown3 days ago
MD Najiur Rahman Shaown আইডি ৩ দিনের জন্য একশন ব্লকে আছে।
Najiur Rahman Shaown
Najiur Rahman Shaown shared a link.3 days ago
Name Email Message .frm-bldr input,.frm-bldr select,.frm-bldr textarea{width:400px}.frm-bldr input[type=
Najiur Rahman Shaown
Najiur Rahman Shaown shared a link.4 days ago
You all know SEO is a long-term game… at least when it comes to Google. And yes, who doesn’t want to be at the top of Google for some of the most competitive terms? But the reality is, we don’t all have the budget or time. So then, what should you do? Well, what if …

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.