হুমকি (শেষ পর্ব)

Share On Social

#হুমকি (শেষ পর্ব) ওদের সাথে আমাদের পরিবারের শত্রুতা নাকি আরও আগে থেকে। যখন বাবা বেঁচে ছিলেন। তিনি মারা যাবার পর এখন আমিই সংসারের সব। বিয়েটাও করা হয়নি। ২ বোন আর ১টা ভাইকে পিতৃস্নেহে মানুষ করার মত গুরুদায়িত্ব আমার উপরেই এসেছিলো। আমিও সব ভুলে ওদের সুখে রাখতে মাত্র ১৭ বছর বয়সে বাবার ব্যবসার হাল ধরলাম। আমার এই ছোট বয়সে আমি ব্যবসায়ের জন্য একেবারেই উপযুক্ত ছিলাম না। কিন্তু যখনি মা আর ভাইবোনগুলোর দিকে তাকাতাম, বুকের ভেতর কেমন যেন করতো। পড়াশোনাটা ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু স্বপ্ন দেখতাম আমার ভাইবোনগুলো অনেক বড় হবে। রুদ্ভাস সবার ছোট হওয়ায় ওর প্রতি একটা আলাদা টান ছিলো। বাসায় ঢুকলেই ভাইয়া ভাইয়া বলে দৌড়ে এসে লাফ দিয়ে কোলে উঠে যেতো। রাত ৮ টা বাজলেই তার অপেক্ষা শুরু হতো। দেয়াল ঘড়িটার সামনে দাড়িয়ে সময় গুনতো কখন আমি বাসায় ফিরবো। একদিন বাসায় এসে দেখি মা কাঁদছে। আমি অস্থির হয়ে জানতে চাইলে মা বললো বাবার মৃত্যুর আগেও নাকি ঐ লোকগুলো একবার এসেছিলো। সেদিন আবার এসেছিলো। ব্যবসায়িক শত্রুতা যে কতটা জঘন্য ছিলো তা আমি সেদিনই বুঝতে পেরেছিলাম যেদিন ঐ লোকগুলো সরাসরি আমার দোকানে এসেই হাজির হলো। বাবার পুরনো বন্ধু আব্বাস শেখের লোক ওরা। কত ভালো সম্পর্ক ছিলো আঙ্কেল আর বাবার। মায়ের কাছে শুনেছি, বাবা আর আব্বাস শেখ একসাথেই ব্যবসা শুরু করেছিলেন। দুই বন্ধুর মধ্যকার ভাঙ্গন শুরু হয় ব্যবসায়ের জের ধরেই। আব্বাস আঙ্কেল ব্যবসায়ের মালিকানা পেতে চায়। কিন্তু বাবা চেয়েছিলেন দুজনে মিলেই ব্যবসাটাকে বড় করবেন। কোন আলাদা মালিকানা হবে না। মতের অমিলে একপর্যায়ে বাবা রাগ করে ঐ ব্যবসা ছেড়ে তার নিজের জমানো টাকায় ব্যবসা শুরু করলেন। আর ঐদিকে আব্বাস আঙ্কেল এর ব্যবসায় ধ্বস নামতে শুরু করে। বাবা ধীরে ধীরে তার ব্যবসা বড় করতে থাকেন এবং একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত হতে থাকেন। আর আব্বাস আঙ্কেল ততদিনে প্রায় অনেকটাই ব্যবসায়ে ক্ষতির স্বীকার হয়েছেন। একদিন আব্বাস আঙ্কেল নিজে বাসায় এসে শাসিয়ে গিয়েছিলেন এটা বলে যে তার ব্যবসা একমাত্র বাবার জন্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ক্ষতিপূরণ বাবাকেই দিতে হবে। বাবা এটা শুনে শুধু অবাকই হলেন না, বাকরূদ্ধ হয়ে গেলেন। তিনি বন্ধুর সাথে ব্যবসা ছেড়েছেন অনেক বছর হলো। এখন এতদিন পরে ওর ব্যবসায় ক্ষতি হয়েছে। তার ক্ষতিপূরণ বাবা কেন দিবেন? নানা তর্ক বিতর্কের মধ্য দিয়েই শুরু হলো শত্রুতা। আঙ্কেল বারকয়েক আমাদের পরিবারসহ মেরে ফেলারও হুমকি দিয়েছিলেন। আসলে মানুষের ভিতরে লোভ আর হিংসা একবার জাগ্রত হলে তা একসময় প্রতিহিংসার রূপ নেয়। একদিন অনেক রাতে বাবার ফোনে কল এলো। ফোন ধরা মাত্রই বাবা বেশ কিছুক্ষন স্তব্ধ ছিলেন। হঠাৎ বসে পরলেন। বাবা হার্ট এ্যাটাক করেছিলেন। তাকে হাসপাতালে নেয়ার পর ডাক্তার বলেছিলো বাবা আর বেঁচে নেই। জানা গিয়েছিলো ঐ রাতে বাবার কাপড়ের দোকানটাকে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিলো। প্রায় ১৫ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছিলো। আমরা আমাদের ছায়াকে হারালাম। তখন থেকে আমিও কষ্ট করতে করতে আজ এ পর্যন্ত এসেছি। বাবার মৃত্যু আমার জীবনের সবথেকে বড় ট্রাজেডি ছিলো। যেদিন আব্বাস শেখের লোকগুলো আমার দোকানে এসে ভয় দেখিয়েছিলো ঐ একই বিষয় নিয়ে। আমি আর চুপ থাকতে পারিনি। বাবার মৃত্যুর বহু বছর পর শত্রুতাটা আবার শুরু হলো। আমি আব্বাস শেখের নামে থানায় একটা রিপোর্ট করালাম। যখন তারা জানতে পারলো, প্রায় ২/৩ দিন পরপরই আমার ফোনে ও বাসার ফোনে মামলা তুলে নেবার প্রেসার আসতে লাগলো। আব্বাস শেখ নিজেও কয়েকবার হুমকি দিয়েছিলেন যে বাবার কোন উত্তরাধিকারীকেই তিনি জীবিত রাখবেন না। আমি সেদিন প্রচন্ড ভয় পেয়েছিলাম। আমার জন্য না। আমার রুদ্ভাসের জন্য। আমার একটা মাত্র ভাই আর আমি। আমার যা খুশি হলেও আমি মন থেকে চাইতাম আমার ভাইটা নিরাপদে থাকুক। কিন্তু একদিন রাতে বাড়ি ফেরার পথে কেউ আমাকে তুলে এনেছিলো। আমি এটা তখন বুঝতে পারলাম যখন আমার জ্ঞান ফিরেছিলো। আমাকে প্রায় ৩ দিন পরপর খেতে দেয়া হতো। বাকি দিনগুলোতে কয়েক ঢোক পানি। আমাকে মামলা তুলে নেয়ার জন্য বারবার প্রেসার দেয়া হচ্ছিলো। জানিনা মাইর খেতে খেতে কতক্ষন জ্ঞানশূন্য হয়ে থাকতাম। যখন আমাকে খোঁজার জন্য থানায় মিসিং কম্প্লেইন করা হলো, আমার ওপর আরো অত্যাচার শুরু হলো। রুদ্ভাস আব্বাস শেখের সাথে বাবার ও আমাদের ব্যবসায়িক শত্রুতার ব্যাপারে জানতো। এবং মারার হুমকির কথাও জানতো। তাই ও সরাসরি আব্বাস শেখকেই সন্দেহ করে আমাকে কিডন্যাপ করার দায়ে থানায় তার নামে কম্প্লেইন করে। আসলে আব্বাস শেখ এর উদ্দেশ্য ছিলো আমাকে ও রুদ্ভাসকে মেরে ফেলা। রুদ্ভাস মরিয়া হয়ে আমাকে খুঁজছিলো। আমি জানিনা রুদ্ভাস কি করে ওদের হাতে ধরা পরেছিলো। রক্তাক্ত ভাইটার যখন জ্ঞান ফিরলো ও আমাকে একবার ও শেষবার ভাইয়া বলে ডেকেছিলো। ও ফ্লোরে পড়ে ছিলো। অসার অবস্থায়। আমি কথা বলতে চেয়েও বলতে পারিনি। আব্বাস শেখ আমার চোখের সামনে রুদ্ভাসকে নিজ হাতে আঘাত করেছিলো। রুদ্ভাস অস্পষ্টভাবে কিছু বলতে চেয়েছিলো। ও হাত দিয়ে আব্বাসের পা টা ধরে ফেলার পর আব্বাস এক কোপে ওর শরীর থেকে ডানহাত টা আলাদা করে ফেললো। ওর আর্তচিৎকার শোনার মত কেউই ছিলো না। ঐ অবস্থায়ই রুদ্ভাসকে আমার সামনে চেয়ারে এনে বসানো হলো। আর পেছনে দাড়িয়ে আব্বাস শেখ ওর গলায় ছুরি দিয়ে জোরে একটা টান দিলো। আমি মুহূর্তেরর মধ্যে রক্তে ভিজে গেলাম। আমার সারা মুখ বেয়ে রক্ত পরছিলো। তারপর রুদ্ভাসের দিকে তাকালাম। ও ধীরে ধীরে ফ্লোরে আছড়ে পরলো। আমি স্পষ্ট শুনেছিলাম আব্বাস শেখ ওকে গুনে গুনে ৯০ টুকরো করার নির্দেশ দিয়েছিলো। আমার জীবনের দ্বিতীয় ও নিষ্ঠুর ট্রাজেডিটা আমার চোখের সামনেই ঘটেছিলো। আমি শুধু নির্বাক তাকিয়ে সবটা দেখছিলাম। সব কিছু কেবল আমাকে ভয় দেখাতে করা হয়েছিলো। যাতে ভয় পেয়ে আমি আর ব্যবসা করার কথা না ভাবতে পারি। বাবার সব ব্যবসার হাল ছেড়ে দিই। রুদ্ভাস মারা গেলো। আমার কলিজাটা। ওকে মেরে ফেলার ৫ দিন পর আমাকে আবার চোখ বেঁধে কোথাও নেয়া হয়েছিলো। আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। শুধু বুঝতে পারছিলাম কোনো গাড়িতে করে আমাকে কোথাও নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো। হঠাৎ আমাকে কোন শক্ত জায়গায় ধাক্কা দিয়ে গাড়ি থেকেই ফেলে দেয়া হলো। আমি মাথায় ও পায়ে প্রচন্ড ব্যাথা পেয়েছিলাম। কিন্তু আমার হাত, মুখ ও চোখ বাঁধা থাকার ফলে আমি কোন সাহায্যই চাইতে পারছিলাম না। আমি জানিনা ওরা আমাকে কেন বাঁচিয়ে রেখেছিলো। আমিও তো বাবার উত্তরাধিকারী। তাহলে আমি কেন বেঁচে রইলাম? আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। যখন চোখ খুললাম, দেখলাম আমি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে। আমার প্রায় সারা শরীরটাই ব্যান্ডেজ করা ছিলো। আমার মা ও বোন দুটো পাশে বসে কাঁদছিলো। বেশ কয়েকদিন আমি কথা বলতে পারিনি। প্রায় ৪ মাস পর ডাক্তার আমাকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ দিলেন। আমি বাসায় ফিরলাম। জানতে পারলাম রুদ্বাসকে কয়েকজন সাদা পোশাকধারী লোক এসে মাঝ রাত্রে বাসা থেকে জোর করে ধরে নিয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু একমাত্র আমিই জানতাম লোকগুলো ছিলো আব্বাস শেখেরই লোক। আমাকে মুখ খুলতে মানা করা হয়েছিলো। আমার জীবনের সবথেকে মর্মান্তিক ট্রাজেডিটাকে আমি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভুলতে পারবো না। ওরা আমাকে জীবন্ত লাশ বানিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। আমার বেঁচে থাকার প্রেরনার এতটুকুও অবশিষ্ট ওরা রাখেনি। আমি আবার ঘুরে দাড়াবো। আবার শুরু করবো। আমার বোন আর মাকে নিয়ে আমি আবার বেঁচে থাকার লড়াইয়ে নামবো। আমার তো সব শেষ। কিন্তু আমি জানি অন্যায়ের শাস্তি ওরা একদিন ঠিকই পাবে। ঘরভর্তি সাংবাদিকদের সামনে বসেই জীবনে ঘটে যাওয়া পরপর দুটো ট্রাজেডির কথা বর্ননা করছিলো রাতুল। সামনে বসা সবাই চোখ মুছছে। রাতুল একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা রুদ্ভাসের ছবির দিকে তাকালো। এমন সময়ে রাতুলের হাতে থাকা মোবাইলটা একটু কেঁপে উঠলো। স্ক্রিনে ভেসে থাকা মেসেজটা ওপেন করে রাতুল চমকে উঠলো। বুঝতে বাকি রইলো না, এই সাংবাদিকদের ভীড়েই আব্বাস শেখের লোক আছে। রাতুল ঘামছিলো। মেসেজে লেখা ছিলো- “কাজটা ভালো করলেনা রাতুল। এরপর রুদ্ভাসের অবস্থায় যেতে তৈরী থাকো।”
.
Facebook Post Link

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.