সন্দেহ ২য় পর্ব – Sabiha Rahman Susmita

Share On Social

দরজা খুলার পর দেখি শুভ্রের সাথে ২ জন ছেলে কলিগ আরেকজন মেয়ে কলিগ দাঁড়িয়ে আছে।মেয়েটির গায়ের শাড়িটি খুব বেশি পরিচিত লাগছিল,ক্ষণিকেই মনে পরে গেলো শাড়ি টা নীলুর পেইজের সেই শাড়ি যা শুভ্র আমার জন্য অর্ডার করেছিল ভেবেছিলাম!
-এই নীরা,কি হয়েছে তোমার?আর কতক্ষণ দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থাকবে?ভেতরে এসো,সবাইকে জিজ্ঞেস করো।
-ওহ,সর‍্যি।আসছি।
-তোমার কি শরীর খারাপ?
-না না,ঠিক আছি আমি।চলো।
ভেতরে গিয়ে দেখি সবাই বসে গল্প করছে।আমি ভিতরে ঢুকতেই শুভ্রের মেয়ে কলিগ টা উঠে এসে আমাকে ধরে বলল-বাহ,ভাবী তো অনেক প্রিটি।অনেক সুন্দর লাগছে তো ভাবী কে কালো শাড়িতে।আমি জোড় করে যেন পানসে হাসি দিয়ে মেয়েটার দিকে তাকাতেই দেখি শাড়িটা এত পাতলা তার ব্লাউজের বড় গলা ভেদ করে শরীরের অনেকাংশ দেখা যাচ্ছে।
-নীরা,উনার নাম সুবাহ।তোমার রান্নার অনেক সুনাম করি,তাই আজকে তোমার কাছে রান্না শিখতে ও টেস্ট করতে নিয়ে এসেছি।কি?ভালো করেছি না?
আমি শুধু পানসে হাসি দিয়েই যাচ্ছি।রাতে সবাই একসাথে ডিনারের পর ডেজার্ট খেতে খেতে গল্প করছিলো সবাই।আমি সুবাহ মেয়েটার আচরণ দেখছিলাম,অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে,সে তেমন একটা শুভ্রের দিকে তাকাচ্ছে না বা তার পাশে এসেও ঘেঁসে বসে নি একবারো।
রাতে সবাইকে বিদায় দিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে শাড়ি খুলছিলাম,হঠাত শুভ্র পিছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরে কাঁধে চুমু খেয়ে বলল-আজ তোমাকে কেন যেন খুব বেশি মায়াবী লাগছিল।
-কেন?অন্যদিন বুঝি খারাপ লাগে দেখতে?
-আহ!কি যে বলো না।আমার বউ কে কখনোই খারাপ লাগে না।তবে আজ একটু বেশি ই সুন্দর লাগছিল।আচ্ছা,কাল তো শুক্রবার,চলো আজ হরর মুভি দেখি কোনো।
আমার খুব ক্লান্ত লাগা সত্ত্বেও রাজি হয়ে গেলাম।আমি চাইছিলাম শুভ্রের সাথে বেশি বেশি সময় কাটাতে,ব্যাপার টা বুঝতে।কিন্তু আজকে অফিসের কলিগ ই যে সেই মেয়েটা তাতে কোনো সন্দেহ নেই,কিন্তু মেয়েটার আচার ব্যবহারে খুব বেশি কিছু বোঝা গেলো না।
শুভ্র ওয়াশরুমে যেতেই আমি ওর মোবাইল চেক করা শুরু করি,কোনো ম্যাসেজ নেই।এমনকি সেদিনের আনসেইভড নাম্বারের ম্যাসেজ টা ও নেই।সন্দেহ টা আরো যেন বেড়ে গেলো।
তবে কি শুভ্র আন্দাজ করতে পারছে যে আমি জেনে গেছি ব্যাপারটা?
খাটের উপর শুভ্রের শার্ট টা নিয়ে লন্ড্রি বাস্কেটে রাখতে যাবো,হঠাত দেখি শার্টের কাঁধের পাশে এক জায়গায় একটুখানি লাল রঙ,লিপ্সটিকের রঙ!
চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পরল শার্টে। এমন সময় ই ওয়াশরুম শুভ্রর থেকে বের হবার শব্দ শুনে চোখ মুছে অন্য রুমে কাজ গোছাতে চলে গেলাম।
রাতে হরর মুভি দেখলেই আমি শুভ্রের কোলে মাথা রেখে কাঁথার নিচে শুয়ে শুয়ে দেখি,বেশি ভয়ঙ্কর সিন আসলেই কাঁথার নিচে মুখ লুকাই।
আজকে আর শুভ্রের কোলে মাথা রাখার রুচি হয়নি আমার,কিন্তু হঠাত ওর ফোনের রিংটোনে ঘুম ভেঙে দেখি আমি ওর কোলেই শুয়ে ছিলাম।আমার মাথা টা আস্তে করে বালিশে রেখে মোবাইল টা নিয়ে একটু দূরে গেলো।
আমি আড়ি পেতে শুনতে লাগলাম তাদের কথপোকথন।
-হ্যালো,পৌঁছেছো?
হ্যাঁ,ও তো ঘুমাচ্ছে।
হা হা হা,আচ্ছা,তাই নাকি?
ওকে,নীরা জেগে যাবে,পরে কথা হবে।বাই।
আমি চুপটি করে ঘুমের ভান করে শুয়ে থাকলাম,ও এসে আবার আমার মাথায় হাত দিতেই চোখ খুলে বললাম-মুভি এখনো চলছে?দেখি কয়টা বাজে বলে ওর মোবাইল টা হাতে নিয়ে কল লিস্টে ঢুকে দেখি একটু আগে সুবাহর নাম্বার থেকেই কল টা এসেছিল।
এভাবে আমার সন্দেহের উপরই দিন চলে যাচ্ছিল,মনের ভেতরে আমি পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছিলাম।কিন্তু প্রমাণের অভাবে কিছুই বলতে পারছিলাম না কাউকে।
হঠাত একদিন শপিংমলে একা একা কেনাকাটা করে ক্লান্ত হয়ে ফুডকার্টে জুস খেতে গিয়ে দেখি,শুভ্র আর সুভা ২ জন জুস খাচ্ছে আর বসে গল্প করছে।
আস্তে করে নেমে গিয়ে,শুভ্রকে কল দিলাম।
-কোথায় তুমি?
-আমিতো একটা মিটিং এর জন্য প্রিপেয়ার হচ্ছি।ক্লায়েন্ট এর সাথে মিটিং আছে।
-ও,আচ্ছা।কখন আসবে বাসায়?
-এইতো,অফিস শেষেই চলে আসবো।
-আচ্ছা,রাখি তাহলে।বাই।
শুভ্র আমাকে এভাবে মিথ্যা বলতে পারে তা আমি কল্পনাও করতে পারিনি।
আমার মাঝে কিসের কমতি যে শুভ্র আমাকে এভাবে চিট করছে!
ছি!নিজেকে যে কেমন ছোটো মনে হচ্ছে তা এই দুনিয়ার কাউকে বুঝাতে পারব না।
কোনোভাবে বাসায় এসে ফ্লোরে বসে অনেক্ষণ কান্নাকাটি করে মা কে কল দিয়ে বললাম কিছুদিন মা এর কাছে থাকবো।আজই আসছি।
রাতে শুভ্র বাসায় এসে আমায় না পেয়ে ফোনের পর ফোন দিয়েছে নিশ্চয়ই।কিন্তু আমার ফোন ছিল বন্ধ।
মায়ের কাছে ফোন এলো,মা যখন বলল আমি মা এর কাছে তখন সে রাতেই আমাকে নিতে আসতে চেয়েছিল।কিন্তু মা বলেছিল আমি অসুস্থ,তাই কিছুদিন থাকতে চাই।
শুভ্র আর কথা বাড়ায়নি।
আর কথা বাড়িয়েও বা কি,ওর মত মানুষের সাথে আমার আর কথা বলতেও রুচিতে বাঁধে।
এভাবে ৩দিন চলে গেলো।আমার অস্থির লাগতে শুরু করলো।শুভ্রকে ফোল ফিলাম,সে রিসিভ করল না।
পরদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠেই রওনা দিলাম বাসার উদ্দেশ্যে। সকালে ফ্রি রাস্তা,৪০ মিনিটে পৌঁছে গেলাম।আমার কাছে এক্সট্রা একটা চাবি ছিল,সেই চাবি দিয়ে বাসায় ঢুকে দেখি ড্রয়িং রুমের সব কিছু এলোমেলো।কেমন যেন নিজের ঘর টা কে নিজের অপরিচিত লাগছিল।এই বাসায় শুধু আমি আর শুভ্র একাই থাকি বিয়ের পর থেকেই।
বেডরুমের দরজা লাগানো,বাইরে থেকে কেমন যেন ফিসফিস আওয়াজ পাচ্ছি।আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। একটা মেয়ের গলার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি।
জোরে একটা শ্বাস নিয়ে দরজা টা খুলেই ফেললাম।
এসি ছেড়ে কম্বল গায়ে দিয়ে শুভ্র ঘুমাচ্ছে,কি যে মায়া লাগছে দেখতে।আর ফিসফিস আওয়াজ টা আসছিল বেডরুমের টিভি থেকে।টিভি ছেড়ে শুভ্র ঘুমিয়ে গেছে।যাক,বুকের মাঝে অনেক বড় পাথর বেঁধে ছিল তা সরল।
কিন্তু শুভ্র তো ধোয়া তুলসী পাতা না তা তো আমি জেনে গেছি।শুভ্রকে দেখতে খুব নিষ্পাপ লাগছে,ইচ্ছা করছে পাশে গিয়ে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিই।কিন্তু এত ভালবাসার মানুষ টার প্রতি আমার অনেক ভয়,ঘৃণা কাজ করতে শুরু করেছে।
-আরে নীরা তুমি কখন এলে?(ঘুম ঘুম চোখে,চোখ কচলে)আমায় ডাকছো না কেন?
-এইতো মাত্র।কেমন আছো তুমি?আর একয়দিন কেমন ছিলে?
-কি হয়েছে তোমার বলোতো,শরীর খারাপ?
-হ্যাঁ,কিছুতো খারাপ।গত কয়দিন ঘুমাতে পারিনি ভালোভাবে, আর শরীরটা এমনি ভালো লাগছে না তাই মায়ের কাছে চলে গিয়েছিলাম।
কথাগুলো বলতে না বলতেই কেমন যেন গা গুলিয়ে বমি আসছিল,দৌড়ে ওয়াশরুমে গিয়ে বমি করলাম।শরীর টা খারাপ লাগছিল কেমন যেন ভার ভার লাগছিল।
শুভ্র সেদিন নিজের হাতে নাস্তা বানিয়ে আমাকে খাইয়ে তারপর অফিসে গেলো।বিছানায় শোবার পর কেমন যেন এক অপরিচিত ঘ্রাণ পেলাম।বুকের ভেতর টা আমার মোচড় দিয়ে উঠলো।
দুপুরের দিকে মাথা ঘুরাচ্ছিল,শরীর খারাপ লাগছিল।বেবিটেস্ট এর স্টিক দিয়ে এমনি রেগুলারের মত টেস্ট করে দেখলাম,জানি পজিটিভ কিছু হবে না তবুও।
কিন্তু আমি নিজের চোখ কে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না,সত্যি পজিটিভ দেখাচ্ছে।
এতদিন পর এই খুশির সংবাদে খুশিতে আমার চোখে জল চলে আসার উপক্রম,কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো শুভ্রের বর্তমান অবস্থা।আমি কি এখন ও কে এই নিউজ দিব?সে তো তখন অনেক বেশি অভিনয় করবে,আমার যত্ন নিবে।কিন্তু বাসার বাইরে তো সেই সুবাহ!
আমার সন্তান এক চরিত্রহীন বাবার পরিচয় নিয়ে বড় হবে!?কেন যেন এটা মেনে নিতে পারছিলাম না।ইচ্ছা করছিল নিজেকে আর নিজের সন্তান কে খুন করে ফেলি,নাহয় শুভ্রকে ই খুন করে ফেলি।
চলবে।
(৩য় পর্বেই শেষ)

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.