মায়ার বাধন ৭ম পর্ব

Share On Social

মায়ার_বাঁধন

৭ম-পর্ব
হঠাৎ একজন বলে উঠলো স্যার প্রীতম তো আমাদের মেহেবুব খন্দকার স্যারের ডাকনাম, আর উনারও তো ওয়াইফ মারা গেছে অনেকদিন আগে, একটা ছোট মেয়েও আছে। তাহলে কি ম্যাডাম তাকেই খুঁজছেন?
আমি কথা গুলো শুনেই যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলাম, চিৎকার করে বলে উঠলাম হ্যা নিশ্চয় সেই হবে, প্লিজ তাকে ডাকুন একটু, উনি কোথায়?
জিএম স্যার বললো তুমি কি সিওর মেহেবুব সাহেবের নামই প্রীতম?
তখন কয়েকজন বলে উঠলো হ্যা স্যার আমরাও শুনেছি মেহেবুব সাহেবের ডাকনাম প্রীতম কিন্তু সেটা ব্যবহার করা হয়না বলে আমরা ভুলেই গেছিলাম। মনে করতে পারিনি। আর উনি তো আমাদের আগে এতকিছু বলেননি তাই বুঝতেও পারিনি, বললে হয়তো ধারনা করতে পারতাম, এখন গল্পটা শুনে মনে হচ্ছে মেহেবুব সাহেবের সাথে মিলে যাচ্ছে।
কিন্তু মেহেবুব সাহেব তো দুদিন হলো অফিসে আসছেন না, উনার মেয়ে অসুস্থ হসপিটালে এডমিট আছে।
#আমি- কি বললেন পরী অসুস্থ হসপিটালে এডমিট? প্লিজ বলুন কোন হসপিটালে আছে? আমাকে উনার নাম্বারটা দিন প্লিজ, আমি উনার সাথে একটু কথা বলতে চাই এখনই।
জিএম স্যার বললেন আমি উনাকে কল দিচ্ছি দাঁড়ান, আমি কথা বলে আপনাকে জানাচ্ছি। বলেই মেহেবুব সাহেবকে কল দিয়ে লাউড স্পিকার অন করলেন যেন সবাই শুনতে পায়। বললেন হ্যালো মেহেবুব সাহেব কেমন আছেন, শুনলাম আপনার মেয়ে অসুস্থ। ওপাশ থেকে মেহেবুব সাহেব সালাম দিয়েই বললেন জি স্যার আমার মেয়েটা দুদিন হলো খুব অসুস্থ। তাকে নিয়ে আমি এখন হসপিটালে আছি।
(গলাটা শুনে আমার কেমন চেনা চেনা লাগলো কিন্তু পুরোটা সিওর নয় এটাই প্রীতম সাহেবের কন্ঠ কিনা কারন আমি উনার ভয়েজটা মোবাইলে শুনিনি আগে আর মোবাইলে আসল কন্ঠ বোঝাও কঠিন যদি না খুব পরিচিত হয়)
তারপর জিএম সাহেব মেয়ের জন্য দোয়া করে বললেন মেহেবুব সাহেব আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করার ছিলো যদি কিছু মনে না করেন। মেহেবুব সাহেব বললেন না না স্যার বলুন সমস্যা নেই। জিএম স্যার বললেন আচ্ছা আপনার ডাক নাম কি প্রীতম? মেহেবুব সাহেব বললেন জি স্যার কিন্তু হঠাৎ আমার ডাক নাম কেন জিজ্ঞাসা করলেন স্যার?
(প্রীতম সাহেবের কথা শুনে আমি আর আনন্দ ধরে রাখতে পারছি না, লাফাতে ইচ্ছা করছে চিৎকার করে, এ যেন আমার বিশাল বিজয়। জানিনা আমার কেন এতটা আনন্দ হচ্ছে, মনে হচ্ছে মানুষের বিরাট একটা স্বপ্ন পুরন হলে যেমন হয় আমার তেমন আনন্দ হচ্ছে)
জিএম স্যার এবার আমার কথা বললেন। বললেন একটা মেয়ে এসেছে আপনার খোঁজে অফিসে, বলেই আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন আপনার নামটা যেন কি? আমি বললাম প্রীমু। উনি ফোনে বললেন প্রীমু নামে একজন আপনার খোঁজে এসেছেন। আপনি চেনেন?
ওপাশ থেকে প্রীতম সাহেব কি(?) বলে চিৎকার করে উঠলেন। (বুঝতে পারলাম এটা তার কাছে স্বপ্নের মতই মনে হচ্ছে) তারপর বললেন প্লিজ স্যার উনি কোথায় উনাকে একটু ফোনটা দিন প্লিজ। উনাকে আমার খুব দরকার স্যার প্লিজ (প্রীতম সাহেব যেন অস্থির হয়ে উঠলেন আমার সাথে কথা বলার জন্য)। জিএম সাহেব ওকে বলেই আমাকে মোবাইলটা দিলেন কথা বলতে।
আমি হ্যালো বলতেই প্রীতম সাহেব কাঁদো কাঁদো কষ্ঠে বললেন ম্যাডাম প্লিজ আপনি আমার মেয়েটাকে একটু বাঁচান, আপনি বিনিময়ে যা চাইবেন তাই দেবো, আপনি শুধু আমার মেয়েটাকে বাঁচিয়ে দিন। আমার মেয়েটা মনে হয় বাঁচবে না, আপনার জন্য কেঁদে কেঁদে না খেয়ে মেয়েটা আমার অসুস্থ হয়ে গেছে। আপনাকে আমি মনে মনে কত যে খুঁজেছি, আল্লাহর কাছে কত যে প্রার্থনা করেছি আল্লাহ যেন আপনাকে একটা বার আমার সাথে দেখা করিয়ে দেন।
(এক নিশ্বাসে কথা গুলো বলেই কান্না করতে লাগলেন ভদ্রলোক। উনার কথাগুলো শুনে আমার চোখ দিয়েও কখন যে জল গড়াতে শুরু করেছে নিজেও বুঝতে পারিনি। পুরো রুম স্তব্ধ হয়ে গেছে প্রীতম সাহেবের কথা শুনে। থমথমে একটা পরিবেশ হয়ে গেছে, এমন কথা আর এমন আবেগঘন মুহুর্ত যেন তারা কখনো দেখেনি)।
আমার গলা দিয়েও কোন কথা বের হচ্ছে না, ধরা গলায় আমি শুধু বললাম আপনি কোথায় আছেন বলুন আমি এখনই আসছি।
উনি হসপিটালের নাম ঠিকানা বললেন। আমি ওকে বলে লাইনটা কেটে দিলাম। আমি জিএম স্যারের থেকে প্রীতম সাহেবের মোবাইল নাম্বারটা চেয়ে নিয়ে সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে তাড়াতাড়ি বের হতে লাগলাম, এমন সময় জিএম স্যার বললেন ম্যাডাম প্লিজ দাঁড়ান আমিও যাবো আপনার সাথে। অসুস্থ মেয়েটার কথা শুনার পর আমারও একটু দেখে আশা উচিত, নয়তো অমানবিক কাজ হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা আপনাদের মা মেয়ের এমন মিলনের মধুর দৃশ্য নিজের চোখে দেখার সৌভাগ্যটা আমি মিস করতে চাই না। আপনি আমার গাড়িতে আসুন।
আমি ঠিক আছে চলুন বলে জিএম স্যারকে নিয়ে হসপিটালে রওনা হলাম। ২০মিনিটের মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম। আমি দৌঁড়ে পরীর কেবিনে গেলাম। আমি পরীর দিকে তাকিয়ে দেখছি স্যালাইন চলছে আর পরী ঘুমাচ্ছে।
আমাকে দেখে প্রীতম সাহেব লাফ দিয়ে খাড়া হয়ে বললেন আপনি এসেছেন? দেখুন আমার মেয়ের কি অবস্থা বলেই কাঁদতে লাগলেন।
আমি ভদ্রলোককে বললাম প্লিজ বলুন কি হয়েছিলো পরীর? কিভাবে এমন হলো? ডাক্তার কি বলেছে?
#প্রীতম সাহেব- আপনি আসবেন বলে মেয়েটা না খেয়ে আপনার জন্য বসে অপেক্ষা করছিলো, আমি অনেক বুঝিয়েও খাওয়াতে পারিনি। ওর একটাই কথা মাম্মাম আসলে মাম্মামের হাতে খাবো নয়তো আমি খাবো না। মাম্মাম বলেছে আসবে একটু পরেই। আমি যদি খেয়ে নিই তাহলে মাম্মাম এসে কষ্ট পাবে, আমি মাম্মামকে একটুও কষ্ট দিবো না তাহলে মাম্মাম রাগ করে আবার হারিয়ে যাবে। আমি হাজার রকম ভাবে বুঝিয়েছি কাজ হয়নি ওর একই কথা। এভাবে না খেয়ে বসে থেকে আপনি যখন অনেক রাত হয়ে গেলেও আসলেন না আর আমাকে বারবার ফোন করতে বললেও যখন ফোন করতে পারিনি আপনাকে তখন কান্না করতে শুরু করলো। কিছুতেই আমি কান্না থামাতে পারিনি। কান্না করতে করতেই এক সময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। তারপর রাতে হঠাৎ প্রচন্ড জ্বর আসে। জ্বরের ঘোরে শুধু মাম্মাম বলে নানা রকম ভুল বকতে বকতে একসময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। আমি দ্রুত হসপিটালে এনে এডমিট করি।
ডাক্তাররা চিকিৎসার পর জ্ঞান ফিরলেও বারবার শুধু মাম্মাম বলেই ডাকছে। ডাক্তার বলেছিলো ওর মাম্মামকে নিয়ে আসুন কিন্তু আপনাকে আমি কোথায় পাবো কোন তো উপায় ছিলো না। শুধু আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছি যেন একটি বার আপনাকে আমার মেয়ের কাছে এনে দেয়। আল্লাহ আমার ফরিয়াদ শুনেছেন।
প্রীতম সাহেব কথা গুলো বলতে বলতে মেয়েদের মত কান্না করছিলেন, আমি ছেলেদের এমন কান্না কখনো দেখিনি। উনার কান্না দেখে আর পরীর কথাগুলো শুনে আমার চোখ দিয়েও টপটপ করে জল পড়তে লাগলো। আমি পরীর পাশে বসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিলাম। বললাম ওকে কি এখন ডাকা যাবে? কখন ঘুমিয়েছে? ডাক্তার কি বলেছে?
#প্রীতম সাহেব- না এ ব্যাপারে কিছু বলেনি ডাক্তার, অনেক সময় হলোই ঘুমিয়েছে। আপনি কি একবার ডেকে দেখবেন?
#আমি- না থাক ঘুমাক, ডাকা হয়তো ঠিক হবে না, একটু অপেক্ষা করি দেখি যদি নিজে থেকে না জাগে তাহলে ডাক্তার আসলে শুনে তারপর না হয় ডাকবো।
আমি পরীর মাথার কাছে বসলাম। জিএম স্যার প্রীতম সাহেবের সাথে বসে সান্ত্বনা দিয়ে নানা রকম গল্প করতে লাগলেন। হঠাৎ পরী মাম্মাম ও মাম্মাম, তুমি কখন আসবে মাম্মাম বলে ভুল বকতে লাগলো আবার।
আমি সাথে সাথে পরীর মাথায় হাত দিয়ে বললাম এই তো আমি এসেছি মাম্মাম, তাকিয়ে দেখো আমি তোমার সামনে। পরী মা তাকিয়ে দেখো আমি কথা রেখেছি আমি এসেছি তোমার কাছে।
পরী আস্তে আস্তে চোখ মেলে আমার দিকে তাকালো, আমাকে দেখেই মাম্মাম বলে চিৎকার করে উঠে আমাকে জরিয়ে ধরে কান্না করতে লাগলো, আমিও কাঁদছি পরীও কাঁদছে। পরী কাঁদছে আর বলছে মাম্মাম তুমি কেন আসনি কেন এত দেরি করলে আমি তোমাকে কত ডেকেছি তাও কেন আসলে না, আমি কত কেঁদেছি তোমার জন্য জানো। এক নিশ্বাসে পরী কথাগুলো বললো।
আমি পরীর কথাগুলো শুনে শুধু অঝর ধারায় কেঁদে যাচ্ছি আর বলছি সরি মা আর এমন হবে না, আমার ভুল হয়ে গেছে, আমি আর কখনো এমন করবো না, আমার খুব ভুল হয়ে গেছে বলে শক্ত করে জরিয়ে ধরলাম পরীকে।
আমাদের এমন কান্না দেখে পরীর বাবাও কাঁদতে শুরু করলো তবে এটা হয়তো ভদ্রলোকের কষ্টের কান্না নয় এটা আনন্দের অশ্রু কারন তার মেয়ে ঠিক হয়ে গেছে কথা বলছে। এগুলো দেখে জিএম স্যারের চোখেও পানি।
#চলবে…
♥স্বপ্না’স খেয়াল

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.