মায়ার বাধন ৬ষ্ঠ পর্ব

Share On Social

৬ষ্ঠ-পর্ব
আমি গাড়ি থেকে নেমে একটা রিক্সাওয়ালাকে ডেকে বললাম কাস্টমস অফিস চেনেন আর এখান থেকে কত দুর হবে? রিক্সাওয়ালা বললো চিনি আপা আর বেশি দুর না ১০ মিনিটের পথ। আমি তাকে নিয়ে রওনা হলাম।
কাস্টম অফিসের গেটে গিয়ে দারোয়ান কে বললাম প্রীতম সাহেব আছেন নাকি? দারোয়ান বললো কোন প্রিতম সাহেব? আমি বললাম এখানে কয়টা প্রীতম সাহেব আছেন? দারোয়ান বললো একটাও নেই। আমি বললাম ঠিক আছে আমি ভেতরে যাবো যেতে দিন। দারোয়ান বললো তাহলে আগে আপনাকে তল্লাশি করতে হবে সব, ব্যাগ খুলুন। আমি ব্যাগ খুললাম। তিনি আমার গায়ে ব্যাগে সব জায়গায় স্ক্যানিং মেশিন দিয়ে চেক করে বললেন এবার যেতে পারেন।
আমি ভেতরে গিয়ে এদিক সেদিক তাকাচ্ছি আর ভদ্রলোককে খুঁজছি। আমার গতিবিধি লক্ষ্য করে একজন এসে বললো ম্যাডাম কার আছে যাবেন কি কাজে এসছেন? আমি বললাম আপনি কে ? তিনি বললেন আমি পিওন। আমি তাকে বললাম এখানে প্রীতম সাহেব কোথায় বসেন? আমি উনার কাছে এসছি।
#পিওন- কোন প্রীতম সাহেব ম্যাডাম এখানে তো এই নামে কেউ নেই। আপনি কাকে খুঁজছেন? উনি কোন পোস্টে আছেন?
পিওনটার কথা শুনে আমার মাথায় বাজ পড়লো। একি বলছে প্রীতম নামে কেউ নেই এখানে? কিন্তু আমার স্পষ্ট মনে আছে ভদ্রলোক এই নামটাই বলেছিলো আর এই অফিসের ঠিকানাই বলেছিলো, তাহলে পিওন কেন এমন কথা বলছে? কোন পোস্টে আছেন সেটা তো বলেননি তাহলে এখন উপায়? ভাবলাম পিওন হয়তো সবার নাম ঠিক মত জানে না, ওরা তো স্যার বস বাবু বলেই সবাইকে ডাকে তাই নাম জানার প্রয়োজন হয় না, আর যত কর্মচারী দেখছি এতগুলোর নাম মনে নাও থাকতে পারে।
#আমি- প্রীতম নামে এখানে একজন আছে আপনি চিনবেন না, আমি নিজে গিয়েই খুঁজে নিচ্ছি বলেই হাঁটা ধরলাম।
পিছন থেকে পিওন ডাকতে লাগলো ম্যাডাম ম্যাডাম প্লিজ এই ভাবে যেখানে সেখানে সবার যাওয়া নিষেধ, আর আপনি মেয়ে মানুষ সব রুমে রুমে এভাবে একা যেতে পারেন না।
#আমি- কেন আমি মেয়ে মানুষ তো কি হয়েছে? একা গেলে আপনার বসদের গিলে খাবো? নাকি তারা অশুদ্ধ হয়ে যাবেন আমাকে দেখলে?
#পিওন- ম্যাডাম আসলে এভাবে প্রতিটা জায়গায় গিয়ে রুমে রুমে আপনি কি করে খুঁজবেন আর অনুমতি ছাড়া স্যারদের রুম গুলোতে প্রবেশ নিষেধ।
#আমি- তাহলে আপনি আমার সাথে সাথে চলুন আর সবার থেকে অনুমতি নিয়ে দিন।
#পিওন- ম্যাডাম এটা কি করে সম্ভব আমার অনেক কাজ আছে আর আপনি তো সঠিক নামও বলতে পারছেন না তাহলে কার কাছে নিয়ে যাবো আমি? নাম না বললেও যদি পদবীটা বলতে পারতেন উনি কোন পোস্টে আছে জানতে পারলে আপনাকে সেখানে নিয়ে যেতাম, কিন্তু আপনি তো কিছুই বলতে পারছেন না। আমাকে মাফ করবেন ম্যাডাম আমি এটা করতে পারবো না, শেষে আমার চাকুরী যাবে।
#আমি- ঠিক আছে আপনি আপনার চাকুরী বাঁচান আর আমি আমার কাজ করি বলেই আবার সব ডেস্কে উঁকি দিতে শুরু করলাম দ্রুত।
পিওনটা পিছে পিছে ডাকছে, পিওনের চিৎকার শুনে অনেকেই এতক্ষনে আমার দিকে তাকাতে শুরু করেছে রহস্যজনক ভাবে। আমি মনে মনে ফঁন্দি আটলাম যদি এভাবে কাজ না হয় এমন ঝামেলা শুরু করবো যাতে অফিসের সব লোকজন দৌড়ে আমার সামনে আসতে বাধ্য হয়, তাহলে প্রীতম সাহেবও নিশ্চয় আসবে আর আমাকে দেখেই চিনতে পারবে। ভদ্রলোক আসলে আর কোন সমস্যাই হবে না নিশ্চয় উনি সবাইকে বোঝাবেন।
আমার তাড়াহুরো করে লাফিয়ে লাফিয়ে উঁকি দেওয়া দেখে প্রতিটা ডেস্কের সবাই লাফিয়ে দাঁড়া হয়ে গেছে। সবার মনে কেমন একটা আতঙ্কের ছাপ দেখতে পাচ্ছি। মনে হয় মহিলা জঙ্গী টঙ্গী ভাবছে। মনে মনে ভাবলাম এটাই তো চাই হা হা হা..।
কয়েকজন মহিলা কর্মকর্তা দুর থেকেই বলতে লাগলো ম্যাডাম আপনি কাকে চান বলুন এভাবে তো অফিসের ভেতরে ঘুরাঘুরি করা যাবে না।
#আমি- আমি প্রীতম সাহেব কে খুঁজছি, আপনারা বলে দিন উনি কোথায়? তাহলেই আমাকে আর ঘুরাঘুরি করতে হবে না।
একজন বললেন ম্যাডাম প্রীতম নামে তো কাউকে চিনছি না উনি কোন পোস্টে আছেন সেটা বলুন?
#আমি- আরে কোন পোস্টে আছেন সেটা জানলে কি আর আমাকে এত চিন্তা করতে হতো? এতক্ষন তো তাকে পেয়েই যেতাম।
আরেকজন বললো ম্যাডাম আপনি এভাবে অফিসের ভেতরে ঘুরতে পারেন না, আপনি জানেন পুরো অফিস সিসি ক্যামেরার আওতায়? তাই আপনি এমন আচরন করলে সমস্যা হবে। আপনি প্লিজ ওয়েটিংরুমে বসুন আমরা কি করা যায় দেখছি।
#আমি- ওকে তাহলে ৫ মিনিট সময় দিলাম তাড়াতাড়ি আপনারা প্রীতম সাহেবকে সামনে আনুন না হলে আমি আবার নিজেই খুঁজতে শুরু করবো বলে আমি বসলাম চেয়ারে। মনে মনে হাসি পাচ্ছে আবার ভয়ও হচ্ছে কোন অফিসে এসে এমন করা তো অন্যায় আর যে দিনকাল পড়েছে কিন্তু বুঝতে দিলাম না কারন আমার কাছে কোন উপায় নেই। আমি নরম হলে এরা আমাকে কোন সাহায্য করবে না কারন আমি সঠিক ভাবে কিছুই বলতে পারছি না। তাই একটু গরম হয়েই কাজ সারতে হবে।
আচ্ছা বলে সবাই চলে গেলো, কিছুক্ষন পর এসে একজন বললো ম্যাডাম আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে এখানে প্রীতম নামে কেউ নেই। আপনাকে হয়তো ভুল তথ্য দিয়েছে কেউ।
চিন্তায় পড়ে গেলাম, ভাবলাম মেয়ে মানুষ একটু নরম গলায় কথা বলে দেখি যদি দয়া হয় নয়তো আর কোন উপায় তো দেখছি না। বললাম আচ্ছা ভাই আপনাদের এমডি স্যার বা জিএম স্যারের সাথে একটু দেখা করা যাবে? প্লিজ তাদেরকে বলুন আমি একটু কথা বলতে চাই। প্লিজ ভাই আমাকে এইটুকু হেল্প করুন আমার খুব দরকার।
তিনি বললেন আসলে ম্যাম এভাবে তো স্যারদের সাথে দেখা করা যায় না আর স্যাররা তো খুবই ব্যস্ত মানুষ। তাও আমি একবার চেষ্টা করে দেখি আপনার জন্য কিছু করতে পারি কিনা। আমি বুঝতে পারছি আপনার অবস্থা।
#আমি- প্লিজ ভাই আপনি যে করেই হোক আমাকে এই হেল্পটা করুন প্লিজ। আপনি উনাদের গিয়ে বলুন তারা কেউ দেখা না করলে আমি এখান থেকে যাবো না। আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবো ভাই।
ভদ্রলোক দেখছি বলে চলে গেলো। একটু পর এসে বললো জিএম স্যার আপনার সাথে দেখা করতে রাজি হয়েছেন আপনি তাড়াতাড়ি আসুন।
আমি তাড়াতাড়ি ভদ্রলোকের সাথে জিএম স্যারের রুমে গেলাম। আমি সালাম দিতেই উনি বসতে বললেন। আমি বসলাম।
#জিএম স্যার- কি হয়েছে আপনার এবার বলুন। কি চান আপনি? শুনলাম বাহিরে নাকি খুব ঝামেলা করেছেন। কিন্তু কেন?
#আমি- প্রথমেই আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি আমার কৃতকর্মের জন্য কিন্তু বিশ্বাস করুন আমি বাধ্য হয়েই এমনটা করেছি। আমি আসলে একজনের খোঁজে এসেছি, তিনি বলেছিলেন এই অফিসেই কাজ করেন। তার নাম প্রীতম। প্লিজ আপনি যদি আমাকে একটু সাহায্য করতেন।
#জিএম স্যার- কিন্তু এই নামে তো কেউ এখানে নেই। উনি কোন পোস্টে আছেন বলেছিলো?
#আমি- আমি সেটা জানিনা।
#জিএম স্যার- আপনার কে হয় সে?
#আমি- আসলে আমার কেউ হয় না বলে তাকে ঘটনাটার সারবস্তু জানালাম। বললাম তার ছোট্ট মেয়েটার জন্য আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, আমি মেয়েটাকে কথা দিয়েছিলাম। আমি শুধু একটা বার তার খোঁজ নিতে চাই। কথাগুলো বলতে গিয়ে আমার গলাটা ধরে আসলো, চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে গেলো।
আমার গল্পটা শুনে জিএম সাহেবের মনটা হয়তো নরম হলো আর আমি একটা বাচ্চার খোঁজ নেওয়ার জন্য এতটা পাগল হয়ে গেছি দেখে উনি হয়তো আমার প্রতি সদয় হলেন। অনেকটা মজাও পাচ্ছেন হয়তো এমন একটা ঘটনার সাথে নিজেকে জড়াতে পেরে। তাই বেশ আগ্রহ নিয়ে বললেন আমি এখন আপনাকে কি করে সাহায্য করতে পারি বলুন।
#আমি- আপনি শুধু ৫ মিনিটের জন্য কষ্ট করে অফিসের পুরো স্টাফকে একজায়গায় হাজির করুন। বাকিটা আমি দেখবো।
#জিএম স্যার- এই আপনার উদ্দেশ্য কি? সবাইকে একজায়গায় করে বোমা হামলা করবেন? নাকি জিম্মি করবেন?
#আমি- প্লিজ এমনটা ভাববেন না, আমি একটা ভদ্র ফ্যামিলির ভদ্র মেয়ে। আমি শুধু সবাইকে একজায়গায় করে প্রীতম সাহেবকে চিনে নিতে চাইছি। আপনি বিশ্বাস করুন উনি আমাকে দেখলেই চিনতে পারবে আর আপনাদের ভুল ধারনাটা পাল্টে দেবে। আপনি শুধু সবাইকে একটু ডাকার ব্যবস্তা করুন আমি সারাজীবন আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবো। বিশ্বাস না হলে আমার সব জিনিসপত্র আপনারা জমা নিতে পারেন।
আমি কথাগুলো বলছিলাম এতটাই বিনয়ের সুরে যে উনি বুঝতে পারলেন আমার অবস্থাটা, আমি যে খুব কষ্ট পাচ্ছি সেটা দেখে জিএম সাহেব বললেন প্লিজ চিন্তা করবেন না, ঠিক আছে আমি দেখছি কি করা যায় বলে পিওনকে ডেকে সবাইকে মিটিং রুমে আসতে বলতে বললেন। বললেন তোমরাও এসো একজনও যেন বাদ না পড়ে। আমাকে নিয়ে নিজেও মিটিং রুমে গেলে।
একে একে সবাই আসছে আমি তাকিয়ে দেখছি আর আমার দুঃচিন্তা বেড়ে যাচ্ছে, গলাটা শুকিয়ে আসছে খুব কান্না পাচ্ছে, ভয়ও হচ্ছে যদি প্রীতম সাহেব সত্যি এখানে না থাকে। তাহলে আমি তাকে কোথায় খুঁজবো? একটু আশার আলো দেখলাম তাও কি অন্ধকারে ঢেকে যাবে?
সবাই আসলো কিন্তু তাদের মধ্যে প্রীতম সাহেব নেই।
জিএম স্যার বললো আপনি যাকে খুঁজছেন এদের মধ্যে কি আছে? আমি তো আগেই বললাম এই নামে কেউ থাকে না।
আমি সবার উদ্দেশ্যে বললাম, প্লিজ আপনাদেরকে কষ্ট দেওয়ার জন্য আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত। আসলে আমার দুদিন আগে প্রীতম নামে একজনের সাথে পরিচয় হয়, ভদ্রলোকের স্ত্রী মারা গেছেন, তার ৪ বছরের ছোট মেয়েটা আমাকে তার মাম্মাম ভেবে এমন আচরন করেন। আমি মেয়েটাকে কথা দিয়েছিলাম দেখা করবো বলে, তাই আমি মেয়েটাকে একবার দেখার জন্য এখানে এসেছিলাম। ভদ্রলোক এই অফিসেই কাজ করে বলেছিলেন তাই আমি এখানে এসে আপনাদের এতটা ঝামেলায় ফেললাম। তার জন্য আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত এবং ক্ষমাপার্থী।
#চলবে…
♥স্বপ্নাস খেয়াল

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.