মায়ার বাধন ২য় পর্ব

২য়-পর্ব
আমি জোরে করে হেসে দিলাম পরীর কথা শুনে। বুঝে গেলাম এই পাঁকনা বুড়ির সাথে কথায় পেরে উঠা আমার সম্ভব নয়। আমি তাকে আর কোন সিরিয়াস প্রশ্ন না করে এমনি নানা রকম গল্প শুনলাম।
একটু পরেই তাদের নামার জায়গা তাই পরীর বাবা পরীকে নিজের কাছে নেওয়ার জন্য বললো “পরী মা আমার কাছে এসো এখনই আমাদের নামতে হবে”।
#পরী- পাপা আমি মাম্মামের কোলেই থাকবো, মাম্মামের সাথে নামবো।
#পরীর বাবা- পরী আর দুষ্টামি করে না মা আন্টিকে খুব জ্বালিয়েছ এবার আমার কাছে এসো। আন্টি এখানে নামবে না।
#পরী- হা হা হা.. পাপা তুমি কি পাগল? মাম্মামকে কি কেউ আন্তি বলে? হা হা হা..
পরীর বাবা আমাকে বললো “সরি আপনি কিছু মনে করবেন না প্লিজ”।
আমি বললাম “না না ঠিক আছে ছোট বাচ্চা না বুঝেই সব বলছে”।
#পরীর বাবা- ও সরি পাপা আমার ভুল হয়ে গেছে, এবার এসো আমাদের নামতে হবে। মাম্মামের তো কাজ আছে তাই মাম্মাম পরে নামবে।
#পরী- না আমি মাম্মামের সাথেই নামবো। আমি মাম্মামকে ছাড়া নামবো না।
#আমি- আমার লক্ষী মাম্মাম তো তুমি, আমার পরী সোনা, তুমি এখন পাপার সাথে নামো আমি একটু কাজ সেরেই আসবো তোমার কাছে।
#পরী- না মাম্মাম তুমি আবার আমাকে ফেলে পালিয়ে যাবে আমি জানি। আমি তোমাকে আর পালাতে দেবো না। তুমি জানো মাম্মাম তোমাকে ছাড়া থাকতে আমার কত কস্ত হয়? পাপারও কস্ত হয়।
আমি কি বলবো বুঝতে পারছি না এতটুকু বাচ্চার মুখে মাকে ছেড়ে থাকার কষ্টের কথা শুনে। আমি চুপ করে রইলাম। পরীর বাবা এবার সত্যি বিরক্ত হলেন মেয়ের আচরনে নিজেকে এতটা লজ্জায় ফেলার জন্য।
#পরীর বাবা- পরী এবার কিন্তু পাপা খুব রেগে যাচ্ছি, তাড়াতাড়ি আসো এখনই নামতে হবে নয়তো গাড়ি ছেড়ে যাবে।
এবার পরী আমাকে শক্ত করে ধরে কান্না করতে শুরু করলো বাবার ধমকের স্বরে কথা শুনে। গাড়ির সমস্ত উৎসুক জনতারা সবাই আবার আমাদের দিকে তাকিয়ে নাটক দেখতে শুরু করলো। এবার আমি কি করবো কিছু বুঝে উঠতে পারছি না। এই মেয়েকে কি করে আমার কোল থেকে ভদ্রলোকের কোলে দেবো? মেয়ের কান্না দেখে ভদ্রলোক খুব বিরক্ত হচ্ছেন কিন্তু জোর করে আমার থেকে ছাড়িয়েও নিতে পারছেন না।
এদিকে গাড়ির মধ্যে শুরু হয়ে গেছে আমাদের নিয়ে গবেষণা। আমরা কেন এমন করছি? নিজেদের মধ্যে ঝামেলা হতেই পারে তাই বলে গাড়িতে উঠে এসব করা কোন ধরনের ভদ্রতা? আমরা এসব নাটক যেন গাড়ি থেকে নেমে বাড়ি গিয়ে করি, আমাদের ঝামেলার জন্য বাচ্চাটাকে কেন কষ্ট দিচ্ছি? এমন মিষ্টি একটা বাচ্চার মুখের দিকে তাকিয়ে হলেও আমাদের সব ঝামেলা মিটিয়ে ফেলা উচিত। আমরা কি করে পারছি এসব করতে বাচ্চার জন্য কি কোন মায়া নাই ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। চলছেই কথার ফুলঝুরি।
ভদ্রলোক মাথা নিচু করে অসহায়ের মত দাঁড়িয়ে আছেন, তিনি জানেন তার এখানে কিছুই বলার নেই। আমার এবার খুব বিরক্ত লাগছে রাগও হচ্ছে সবার ওপর, ভদ্রলোকের উপর আরও বেশি হচ্ছে। কেন সবাইকে বলে দিচ্ছে না যে আমি তাদের কেউ নই।
আমি এখন কি করবো? সবাইকে কি বলে দিবো আমি এদের চিনি না। কিন্তু আমি বললেই কি এরা সবাই বিশ্বাস করবে? আর মেয়েটিকেই বা কি করে কোল থেকে নামাবো? ও গড মাথায় কিছু আসছে না আর, পাগল হয়ে যাবো মনে হচ্ছে।
গাড়ি থেকে গেলো, যারা নামবে তাদেরকে ডাকা হচ্ছে, অনেকেই নেমে গেলো কিন্তু ভদ্রলোক মেয়ের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আস্তে আস্তে বলছে “মা এসো আমরা এবার না নামলে আর নামতে পারবো না গাড়ি ছেড়ে দেবে, তুমি আমার সোনা মা এসো”। কথাগুলো বলতে বলতে ভদ্রলোকের চোখ দিয়ে যেন জল গড়িয়ে পড়লো। তিনি লজ্জায় অপমানে কষ্টে নিজের চোখের পানিটা আর ধরে রাখতে পারলেন না।
গাড়ির লোকজন সেটা দেখে এবার আমার উপর চড়াও হলো, আপনি কেমন মা বলুন তো? আপনি তো মা নামের কলঙ্ক, নিজের রাগ আর জিদই আপনার কাছে বড় হলো সন্তানের থেকে? আপনি গাড়ি থেকে নামুন, নেমে গিয়ে যা খুশি করুন আমরা দেখতে যাবো না কিন্তু গাড়ির মধ্যে এসব করতে দেবো না। আপনার মত মেয়েদের দেখেই বাকি মেয়েরা নষ্ট হয়। আরো কি কি যে বলছে সেগুলো আমার আর কানে ঢুকলো না, আমি যেন আর নিজের মধ্যে নেই।
আমি বুঝে গেলাম এখানে আমি হাজার চিৎকার করে বললেও কাউকে বিশ্বাস করাতে পারব না আমার কথা গুলো, বরং এখন না নামলে এরা সবাই মিলে জোর করে আমাকে নামিয়ে দেবে। তার থেকে ভালো আমার নেমে যাওয়াই উচিত অন্তত সকলের থেকে বাঁচতে। আমার রাগে দুঃখে নিজের মাথার চুল নিজেই টেনে ছিড়তে ইচ্ছে করছে। কি ক্ষনে যে আলগা পিরিত দেখাতে গেলাম আর তার মাসুল হিসেবে এত অপমান সহ এক স্টপিজ আগেই নেমে যেতে হচ্ছে। এখান থেকে আবার কি করে যে যাবো? লোকাল গাড়ি গুলোতে নিশ্চয় বাদুড় ঝুলা হয়ে যেতে হবে। যাক এখন এসব ভাবতে গেলে আরও রাগ হবে তার চেয়ে বরং এখান থেকে তো আগে বাঁচি, বাকিটা পরে দেখা যাবে।
আমি ভদ্রলোককে আমার ব্যাগ দেখিয়ে দিয়ে বললাম “এগুলো আমার ব্যাগ আপনি নিয়ে নামুন আমি পরীকে নিয়ে নামছি”।
ভদ্রলোক কোন কথা না বলে প্রভু ভক্ত ভৃত্যের মত নিচের দিকে তাকিয়ে মাথাটা নাড়ালেন শুধু।
পরী আমাকে যে ভাবে শক্ত করে জরিয়ে ধরেছিলো ঠিক সেভাবেই আছে, কোন সারা শব্দ নেই, পৃথিবীর কোন শক্তিই যেন নেই তাকে আমার কাছে থেকে আলাদা করে। আমি পরীকে নিয়ে আগে নামলাম ভদ্রলোক পরে নামলো ব্যাগগুলো নিয়ে।
#চলবে..

♥স্বপ্না’স খেয়াল♥

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.