মায়ার বাঁধন ১৩তম পর্ব ও শেষ পর্ব

 

মায়ার বাঁধন


১৩তম পর্ব
আমি রুমনকে সাফ জানিয়ে দিলাম তোমার সাথে এজনমে আমার আর দেখা হোক সেটা আমি চাই না, দয়া করে আমার সাথে আর কোন কম যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে না, আমি আমার অতীতকে বর্তমানে টেনে বেড়াতে চাই না। ভালো থেকো, বাই বলেই লাইনটা কেটে দিলাম।
এভাবে প্রায় ৬ মাস কেটে গেলো, এর মধ্যে প্রীতম সাহেবের অফিসে গিয়ে জানতে পারি তিনি টেন্সফার নিয়ে চলে গেছেন তবে কোথায় গেছেন কাউকে জানায়নি এবং অফিসেও আসেননি কারো সাথে দেখাও করেননি। রুমন এর মাঝে অনেকবারই কল দিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছে কিন্তু আমি ওর কল কোনদিন আর রিসিভ করিনি। অনেকবার ভেবেছি সীমটা চেন্জ করে ফেলবো কিন্তু পরীর কথা ভেবে করতে পারিনি যদি হঠাৎ কোনদিন প্রীতম সাহেব কল দেয় সেই আশায়, সীম চেন্জ করলে তো আর কোন সুযোগই থাকবে না যোগাযোগের। যদিও এতদিনে বুঝে গেছি এটা আমার মিথ্যে আশা তারপরও মনকে বোঝাতে পারিনি।
এদিকে রাস্তা ঘাটে নানা মানুষের নানা রকম কটুক্তি শুনতে হয় প্রতিদিনই, এগুলো নিয়ে বাড়ির মানুষগুলোও বিরক্ত হয়ে গেছে। ওদের এখন একটাই কথা আমাকে বিয়ে করতে হবে যার সাথেই হোক। আমিও জানিয়ে দেই বিয়ে করবো না কিন্তু কেউ আমার কথা শুনতে রাজি নয়, তাদের একটাই কথা আমাকে বিয়ে করতেই হবে আর এটাই শেষ কথা। আমি শেষে বাধ্য হয়ে বিয়েতে রাজি হই।
কয়েকদিন পর আম্মা বললো একটা বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে ছেলেরা আমাকে রাস্তায় দেখেই পছন্দ করেছে এখন আমি পছন্দ করলেই কথা পাকা করবে। আমি আম্মাকে জানিয়ে দিলাম আমার দেখা লাগবে না আপনারা পাকা কথা দিয়ে বিয়ের দিন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঠিক করে ফেলুন, কানা খোরা যাই হোক আমি তাকেই বিয়ে করতে রাজি আছি অন্তত কলঙ্কটা তো ঢাকতে পারবো। শুধু বিয়ের দিনটা কবে সেটা আমাকে জানিয়ে দিলেই হবে।
আম্মা মন খারাপ করে চলে গেলেন। এদিকে কেউ আর আমার মতামতের তেমন প্রয়োজন মনে করলেন না, একবার যখন হ্যা বলেছি সেই সুযোগেই সবাই কাজ সেরে ঝামেলা মুক্ত করতে চাইলেন।
সামনে সপ্তাহেই বিয়ে, বেশি দেরি করা যাবে না যদি আমি আবার বেঁকে বসি তাই তাড়াতাড়ি ডেট টা করে ফেলেছে, হয়তো সম্ভব হলে কালই দিয়ে দিতো কিন্তু একদিনে তো আর বিয়ের আয়োজন সম্ভব নয় তাই ৭ দিন দেরি করলো। তবে আয়োজন এবার আর লোক দেখানো হবে না কারন যদি আবার আগের বারের মত হয় তখন তো মুখ দেখানোই সবার দায় হবে, আমার কপাল বলে কথা, এমন হবে না যে তার কোন ভরসা কারো নেই। তাই ঘরোয়া পরিবেশেই এবার বিয়েটা সারতে চায় শুধু কিছু নিজেদের লোক থাকবে।
বিয়ের দিন আমাকে কনের সাজে সাজানো হলো কিন্তু কেমন সাজালো ভুত না পেতনি বানালো সেগুলোতে আমার কোন মাথা ব্যথা নেই, আমার যে আজ বিয়ে হচ্ছে সেটাতেও আমার মনে কোন অনুভুতি কাজ করছে না, আমার শুধু বারবার আগের বারের ঘটনাটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে, পরীর কথাগুলো মনে পড়ছে, প্রীতম সাহেবের সব কথা, আমাকে সেফ করার চেষ্টা, চলে যাওয়া, রুমনের অপমান সবগুলো চোখের সামনে এসে নাচানাচি শুরু করেছে।
হঠাৎ একজন এসে বললো এখন কাজী সাহেব আসবেন বিয়ে পড়াতে সবাই রেডি হও। একজন আমার মাথার ঘুমটা টা সামনে টেনে দিয়ে পুরো মুখ ঢেকে দিলেন যেন আমাকে কেউ দেখতে না পায়। আমি পুতুলের মত বসে আছি আমার পাশে কয়েকজন বসলো। কাজী সাহেবের সাথে আরো বেশ কয়েকজন পুরুষ মানুষ ঘরে ঢুকলেন বিয়ে পড়ানো আর স্বাক্ষী হওয়ার জন্য। কে কে এসেছে আমি কাউকে দেখতে পেলাম না কারন এতবড় ঘোমটা টানা তার ওপর আমি মাথা নিচু করে বসে আছি, কাউকে দেখারও ইচ্ছে হলো না।
কাজী সাহেব বিয়ে পড়াতে শুরু করলেন, বললেন উমুকের এত নাম্বার মেয়ে মোছা:… এর সাথে এতটাকা দেনমোহর ধার্য্য করে উমুকের এত নাম্বার ছেলে উমুকের সাথে বিয়েতে রাজি আছেন? রাজি থাকলে কবুল বলুন। আমি নামটা শুনে চুপ করে বসে রইলাম। আবারও কাজী সাহেব একই জিনিস পড়ে শুনালেন, আমি আবারও নামটা শুনে চমকে উঠলাম ভুল শুনলাম না তো? সবাই আমাকে ধাক্কা দিয়ে বলতে শুরু করলো কবুল বল কবুল বল, কেউ বললেন তাড়াতাড়ি বলো মা কবুল, বিয়ের দেরি হয়ে যাচ্ছে যে। আমি কারো কথায় সারা দেওয়ার অবস্থায় নেই এখন। কাজি সাহেব ৩য় বারের মত একই জিনিস পড়ে শুনালেন, আমি মনোযোগ দিয়ে শুনলাম এবার ভুল হওয়ার কোন সুযোগ নেই। সবাই রাগ করতে লাগলেন, অনেকে ধমকও দিতে শুরু করলেন কবুল না বলাতে। আমার চোখ দুটো জলে ভেসে যাচ্ছে সেটা কেউ দেখতে পেলো না।
আমি কাউকে কিছু না বলে লাফ দিয়ে বেড থেকে নেমে দৌড় দিলাম বাহিরে। সবাই চিৎকার শুরু করলো এই কনে কোথায় পালাচ্ছে? কি হলো এই কেউ ধরো কনেকে, কনে পালিয়ে গেলো।
আমার পিছন পিছন রুমের সবাই দৌড়ে বের হয়ে আমাকে ধরতে ছুটলো, এতক্ষনে বাহিরের সবার নজরেও পড়েছে আমার দৌড়ে পালানো আর সকলের ধর ধর বউ পালালো চিৎকারে।
আমি কারো দিকে না তাকিয়ে সোজা বরের আসনের সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম, একি আমার সামনে রুমন দাঁড়িয়ে আছে। আমি রুমনকে দেখে চমকে গেলাম, রুমন আমার দিকে তাকিয়ে হাসতে শুরু করলো। আমি হা হয়ে তাকিয়ে আছি ওর দিকে।
হাসতে হাসতে রুমন বললো কি ম্যাডাম তোমাকে চমকে দিলাম তো? বলেছিলে না আমাকে, এজনমে আর আমার মুখ দেখতে চাও না? ঠিক তো দেখতেই হলো বলো? এবার কি বলবে? হায় হায় ভুল করে মুখটা দেখে ফেললে তো এখন তাহলে উপায়? তোমার এজনম কি তাহলে বৃথা হয়ে গেলো? বলেই হা হা করে হাসতে শুরু করলো।
আমি রুমনের মুখের দিকে তাকিয়ে হা করে শুধু ওর কথা গুলো শুনছিলাম কিছু বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছি, আমার মুখ যেন ফেবিকলে আটকে গেছে।
হঠাৎ রুমনের পিছন থেকে দৌড়ে এসে মাম্মাম বলে চিৎকার করে জড়িয়ে ধরলো পরী, আমি পরীকে দেখেই মাম্মাম বলে জড়িয়ে ধরে জোরে জোরে কান্না শুরু করে দিলাম। আমিও কাঁদছি পরীও কাঁদছে। আমাদের কান্না দেখে বিয়ে বাড়ির সবাই এসে আমাদের ঘিরে ধরলো। কেউ আমাদের থামাতে পারছে না ছাড়াতেও পারছে না, এত শক্ত করে দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরেছি। আমাদের এমন দৃশ্য দেখে কেউ আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারলো না সবাই কান্না করতে শুরু করলো। পুরো বাড়ি যেন চোখের জলে ভেসে গেলো তবে সেটা কারোরই দুঃখের নয় আনন্দের অশ্রু এগুলো।
হঠাৎ পিছন থেকে একজন বলে উঠলো শুধু মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কান্না করলেই হবে মেয়ের বাবার দিকেও তো একটু তাকাতে হবে নাকি? আমি কথাটা শুনেই পরীকে ছেড়ে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি প্রীতম সাহেব। আমি উনাকে দেখেই উঠে সামনে দাঁড়ালাম, উনার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রইলাম, চোখ বেয়ে জল গরিয়ে চলেছে শুধু।
#প্রীতম সাহেব- বলে উঠলো ওরে বাবা ওতো বড় চোখ করে এভাবে তাকিয়ে থাকলে তো আমি ভৎস্ম হয়ে যাবো।
#আমি- আজ কেন এসেছেন আমার কাছে? করুণা করতে? এতদিন তো একটু খোঁজ নেওয়ারও প্রয়োজন মনে করেন নি? তবে আজ কি মনে করে? আপনার কোন দয়া বা করুণা আমার চাই না।
#প্রীতম সাহেব- আসলে এর মধ্যে অনেক ঘটনা ঘটে গেছে আমি আর পরী কার মধ্যে দিয়ে দিন পার করেছি তা আপনি জানেন না। রুমন সাহেব যদি আমাকে সবটা না জানাতো তাহলে আমি কোনদিনই কিছু জানতে পারতাম না।
#আমি- রুমন? রুমন আপনাকে কোথায় পেলো?
#রুমন- আসলে উনাকে খোঁজার জন্য আমি সব জায়গায় গেছি, উনার বাড়ির ঠিকানা জোগার করে অনেক চেষ্টার পরে উনার দেখা পেয়ে সবটা জানাই। তোমার বাড়ির লোকজনও সব জানে কিন্তু কেউ তোমাকে সত্যিটা জানায়নি কারন আমার বারন ছিলো। আমি চেয়েছিলাম তোমাকে চমকে দিতে, আমি পেরেছি। এবার তো আমাকে ক্ষমা করাই যায় নাকি?
আমি রুমনের মুখের দিকে তাকিয়ে মাথা নত করে ফেললাম, কৃতজ্ঞতায় চোখে জল চলে এলো।
#রুমন- এই যে ম্যাডাম আপনার কান্না দেখতে চাইনি আমি একটু হাসি দেখতে চেয়েছিলাম আর নিজের অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত্য করতে চেয়েছিলাম। দয়া করে একটু হেসে আমাকে মুক্তি দিন।
#আমি- ভেঁজা চোখেই হেসে উঠে বললাম তোমার প্রতি চিরজীবনের মত ঋণী হয়ে গেলাম। সারাজীবন তোমার এই উপকারের কথা ভুলবো না আমরা। কিন্তু তুমি যাকে নিয়ে এসেছো সে কি তোমার কথা শুনে আমাকে করুণা করতে এসেছেন? তাকে বলে দাও আমি কারো করুণা নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই না।
#প্রীতম সাহেব- না এটা কোন করুণা বা দয়া নয়, আপনি হয়তো জানেন না আমি আপনাকে কতটা ভালোবাসি, আপনি আমার জীবন, আমার প্রতিটা প্রশ্বাসে মিশে আছেন। আপনাকে ছাড়া বেঁচে থাকা আমার জন্য কতটা যন্ত্রনার তা এই কয়েক মাসে বুঝেছি।
#আমি- তাহলে কেন এভাবে ফেলে চলে গেছিলেন? কেন একবারও বলেননি আপনি আমাকে ভালোবাসেন? আপনি জানেন আপনার মুখে এই কথাটা শুনার জন্য আমার মনটা কতটা উতলা হয়ে অপেক্ষা করেছে প্রতিটা মুহুর্তে?
#প্রীতম সাহেব- আমি কি করে বলতাম? যেদিন বলবো বলে স্থির করেছিলাম সেদিনই আপনি রুমন সাহেবকে নিয়ে গিয়ে পরিচয় করিয়ে দিলেন আর আমি জেনে গেলাম আপনি অন্য কারো বাগদত্তা, এটা জানার পরও কি করে বলতাম?
#আমি- হয়েছে আর যুক্তি দেখাতে হবে না বলেই কান্না করতে লাগলাম।
প্রীতম সাহেব আমার চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বললো আর কোন কান্না নয় এখন থেকে শুধুই হাসি, প্লিজ একটু হাসুন।
#আমি- বললাম হাসতে পড়বো না।
#প্রীতম সাহেব- আচ্ছা ঠিক আছে হাসতে না পারলে নাকটা তো মুছতে পারবেন, নাকের পানি চোখের পানি তো এক হয়ে গেছে। বলেই হাসতে লাগলো।
আমি লজ্জা পেয়ে হেসে উঠে প্রীতম সাহেবের পাঞ্জাবীতে নাকটা মুছে দিয়েই জড়িয়ে ধরলাম, উনিও আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো আই লাভ ইউ। আমি উনাকে আই লাভ ইউ টু বলতেই পরী আমাদের মাঝে ঢুকে গিয়ে বললো আই লাভ ইউ মাম্মাম পাপা। আমি আর প্রীতম সাহেব দুজনই একসাথে বলে উঠলাম উই লাভ ইউ টু মাম্মাম বলেই আমরা তিনজনই একে ওপরকে জড়িয়ে ধরে হাসতে লাগলাম।
আমাদের এমন মিলন দেখে সবাই হাসতে হাসতে হাত তালি দিতে লাগলো।
আমাদের জন্য সকলে দোয়া করবেন আর সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা রইলো, শুভ নববর্ষ। নতুন বছর সকলের জীবনে এমন আনন্দ বার্তা বয়ে আনুক এই শুভ কামনায় সকলে ভালো থাকবেন। ধন্যবাদ।
#সমাপ্ত
♥স্বপ্না’স খেয়াল♥
April 13 2018
**এই গল্পের লেখকের অনুমতি সাপেক্ষে প্রকাশিত হয়েছে। ফেসবুকে লেখকঃ Salma Swopna

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.