মায়ার বাঁধন ১০ম পর্ব

Share On Social

মায়ার_বাঁধন

১০ম-পর্ব
রুমন আমার জোরাজুরিতে খুব রেগে গেলো কিন্তু ও যতই রাগুক আমি ওকে ছাড়লাম না, আমারও একটাই উদ্দেশ্য যে করেই হোক আমাকে রুমনের কাছে থেকেই জানতে হবে বিষয়টা কারন প্রীতম সাহেব জীবনেও বলবে না যে রুমন তাকে খারাপ কিছু বলেছে। তাই আমার জিদটাও বাড়িয়ে দিলাম। রুমন রেগে গিয়ে একসময় বলে দিলো কি বলেছে।
#রুমন- হ্যা আমি তোমার প্রীতম সাহেবকে বলেছি কেন বিয়ে করছেন না? একটা বিয়ে করে নিলে তো আর এসব ঝামেলা হয় না, তুমি কতদিন আর এভাবে সময় দিতে পারবে? কয়দিন পর তোমার সাথে আমার বিয়ে হলে তো সময় পাবে না, নিজের সংসার হবে, কেন তোমার সাথে এভাবে মিশছেন? এটা তো সবার চোখে খারাপ দেখাচ্ছে, মানুষ বাঁজে কথা বলবে। আর আমি চাই না আমার হবু বউকে নিয়ে কেউ কোন বাঁজে মন্তব্য করুক। এটা আমার পরিবার জানলে মেনে নেবে না বরং আমাদের বিয়েটায় ঝামেলা সৃষ্টি হবে।
#আমি- এগুলো শুনে প্রীতম সাহেব কি বললো তোমাকে?
#রুমন- কোন উত্তরই প্রীতম সাহেব দিতে পারেনি, শুধু মাথা নিচু করে কথা গুলো শুনে গেছে আর বলেছে সে চেষ্টা করবে তোমাকে আর বিরক্ত না করতে। যেহেতু তুমি আমার হবু বউ সেহেতু আমি না চাইলে তোমার সাথে আর কোন যোগাযোগ করবে না বলে কথা দেয়। আমি বলেছি আমি চাই না। তখন প্রীতম সাহেব বলেছে ঠিক আছে তাহলে তোমাকে আর কল দেবে না।
আমি রুমনের কথাগুলো শুনে যেন আকাশ থেকে পড়লাম, একটা মানুষ কিভাবে এমন আচরন করতে পারে আরেকটা অসহায় মানুষের সাথে? আমার এতটাই রাগ হলো বোঝাতে পারবো না শুধু রুমনকে বললাম তুমি কি মানুষ? আমার অবাক লাগছে কি করে পারলে এসব বলতে? আমি তোমার কাছে এমনটা আশা করিনি বলেই লাইনটা কেটে দিলাম। আমার কখনো ঝগড়া করতে ভালো লাগে না, সব সময় ঝগড়া এরিয়ে চলতে চাই আর রুমনের সাথে কথা বলারই রুচি হারিয়ে গেছে ঝগড়া করবো কি।
আমার সারারাত ভালো ঘুম হলো না শুধু প্রীতম সাহেবের মুখটা ভেঁসে উঠছে, মনে হচ্ছে ভদ্রলোক কতটা কষ্ট পেয়েছেন আর কতটা কষ্টে নিজের সব কষ্ট লুকিয়ে আমার সাথে হাসিমুখে ভালো থাকার অভিনয় করেছেন? আমি কি বলবো তাকে? কি করে মুখ দেখাবো? আমাকে এতটা ছোট করে দিলো রুমন? এখন যদি প্রীতম সাহেব আমার সাথে আর যোগাযোগ না করেন তাহলে আমি কি করে থাকবো? সারাদিন সেজন্যই একবারও আমাকে কল দেয়নি বরং আমি দিলেও সহজে রিসিভ করতে চায়নি। কিন্তু তবুও আমাকে কিছু বলেনি পাছে আমি কষ্ট পাই। এত ভালো যে মানুষটা তাকে কি করে রুমন এতটা কষ্ট দিলো?
এসব ভাবতে ভাবতে ভোর হয়ে গেলো। আমি উঠে একটু হাটাহাটি করে এসেই প্রীতম সাহেবকে কল দিলাম। কয়েকবারের পর রিসিভ করে কথা বললো। আমি বললাম আমার সাথে একটু দেখা করতে পারবেন? বললো অনেক কাজ আছে আজ দেখা করা হয়তো সম্ভব হবে না। আমি বুঝলাম কেন আমাকে এরিয়ে যাচ্ছে। তাই আমিও জিদ করলাম, বললাম আপনার সব কাজ জাহান্নামে যাক আমার সাথে আপনাকে দেখা করতে হবে। আমার এত জোর করে কথা বলাতে তিনি আর না করার সাহস পেলেন না, হয়তো আমাকে না করার ক্ষমতা তারও নেই। এতটা অধিকার বোধ নিয়ে কথা বলার পর নিজের আচরনে নিজেই অবাক হলাম।
প্রীতম সাহেবের সাথে একটা রেস্টুরেন্ট দেখা করলাম। আমি তাকে বললাম রুমন আপনাকে কি বলেছে?
#প্রীতম সাহেব- আরে না উনি তো খুব ভালো মানুষ, আমাকে তেমন কিছু বলেনি, উনি আপনাকে খুব ভালোবাসেন।
#আমি- আপনি যতই লুকান আমি সব জানি, রুমন আমাকে সব বলেছে। আমি তার হয়ে আপনার কাছে ক্ষমা চাইছি, আমি ভাবতেই পারিনি ও এসব কথা আপনাকে বলতে পারে।
#প্রীতম সাহেব- না না এতে উনার কোন দোষ নেই, সত্যি তো আমরা একটু বেশি বেশি করছিলাম, কোন ছেলেই এটা মেনে নিবে না যে তার হবু বউয়ের এমন একটা সম্পর্ক থাকুক। ভুলটা আমারই। আমার আগেই এটা ভাবা উচিত ছিলো।
#আমি- প্লিজ আপনি এভাবে বলবেন না। রুমনের সাথে আমি বুঝবো।
#প্রীতম সাহেব- না, এটা নিয়ে আপনারা কোন ঝামেলা করেন তা আমি চাই না, দুদিন পর যার সাথে আপনার বিয়ে হবে, সারাটা জীবন এক সঙ্গে কাটানোর চিন্তা করছেন, তার সাথে এমন বিষয় নিয়ে ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি করবেন না তাতে আপনাদের দাম্পত্য জীবনে প্রভাব পড়তে পারে। আর আসলেই তো আপনি আর কয়দিনই বা সময় দিতে পারবেন শুধু শুধু দুদিনের জন্য এত ঝামেলা, প্লিজ করবেন না, এটা আমার অনুরোধ। আর দুদিনের জন্য মিছে মায়া বাড়িয়ে লাভ কি? তার থেকে এখনই সময় আস্তে আস্তে দুরে সরে যাওয়াই ভালো।
#আমি- রুমনের সাথে আমি কি করবো না করবো সেটা আমি বুঝবো, এটা নিয়ে আপনাকে চিন্তা করতে হবে না। আর ওর সাথে আমার বিয়ে হবে বলেই যে আমাকে ওর সব কথা শুনে উঠতে বসতে হবে এমন কোন চুক্তি নেই, আমার ব্যক্তিগত একটা মতামত থাকতে পারে, ইচ্ছা অনিচ্ছা থাকতে পারে, ভালো লাগা মন্দ লাগা থাকতে পারে, কাউকে বিয়ে করা মানেই তার কাছে নিজেকে বিক্রি করা নয়। আমারও ব্যক্তি স্বাধীনতা আছে, আমি জানি আমি কোন অন্যায় করছি না আর আমি যখন জানি অন্যায় করছি না তখন কারো কথায় কেন সেটা বাদ দেবো? আমি এতটা ব্যক্তিত্বহীন মেয়ে নই। হ্যা রুমনের বিষয়টা আমি বুঝতে পারছি তাই বলে ও আমার বিষয়টা বুঝবে না? আমি তো এখনো ওর বাড়ি যাইনি। যাই হোক এটা নিয়ে আপনাকে কোন মাথা ঘামাতে হবে না সেটা আমি বুঝে নিবো। দয়া করে ফোনটা রিসিভ করবেন। সম্পর্ক আপনার সাথে আমার, এখানে রুমন কেউ না তাই রুমনের কথায় আপনি কেন আমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করবেন? রুমনের সাথে আমার সম্পর্ক তাই ওকে কি করে ম্যানেজ করবো সেটা আমার ব্যাপার। মনে থাকে যেন বলেই উঠলাম।
প্রীতম সাহেব কোন উত্তর না দিয়ে শুধু মাথা নিচু করে আমার কথাগুলো শুনে গেলো, হয়তো অবাকও হচ্ছে আমার এতটা অধিকার করে কথা বলা শুনে, আমার নিজেরও তো অবাক লাগছে নিজের আচরনে।
বাড়িতে এসে কল দিয়ে কথা হলো। আগের মতই নিয়মিত কথা বলছি তবে প্রীতম সাহেব নিজে থেকে আর কল দেয়না, আমিই দেই কারনটা আমি জানি তাই উনাকে এবিষয়ে কিছু বলিনা, আমি জানি এটা ভুলতে একটু সময় লাগা স্বাভাবিক।
ইদানিং আমার অধিকার বোধটা কেন জানি বেড়েই চলেছে, মাঝে মাঝে কেমন অভিমান হচ্ছে কথায় কথায়, কেমন রাগ দেখিয়ে কথা বলি প্রায়ই তবে ভদ্রলোক আমাকে কিছু বলেনা সব সহ্য করে নিজেই সরি বলে আমাকে শান্ত করে।
রুমনের সাথে এটা নিজে বেশ তর্ক হয়, একপর্যায়ে ওকে আমি বোঝাতে সক্ষম হই। রুমন বলে ঠিক আছে কথা বলতে পারো কিন্তু বেশি নয় মাঝে মাঝে আর এভাবে দেখা করা যাবে না দুদিন পরপর। আমিও তাকে শান্ত করতে বলি ঠিক আছে। কিন্তু রুমন যতই পরী আর প্রীতম সাহেবকে নিয়ে আমার সাথে তর্ক করে বা বাঁজে কথা বলতে চায় আমার ততই ওদের প্রতি মায়া টা বেড়ে যায়, ওদের জন্য কষ্ট হয়। রুমনের আচরন আর প্রীতম সাহেবের আচরন গুলোর মধ্যে কেমন পার্থক্য তৈরী হয় আমার মনে। মনে হয় রুমনটা এমন কেন প্রীতম সাহেবের মত ভালো কেন নয়? আবার কিছু সময় পরই মনে হয় রুমন আমাকে অনেক ভালোবাসে তাই এমন হিঃসা করে, আমি হলেও তো এমনই করতাম। কেউ কি তার ভালোবাসার মানুষের ভাগ অন্য কাউকে দিতে পারে? আমিও তো পারবো না।
কিছুদিন পর রুমনের বাবা দেশে আসে, রুমন আর এক মুহুর্ত দেরি করতে চায় না বিয়ের জন্য, তাই তাড়াতাড়ি ১সপ্তাহের মধ্যে বিয়ের দিন ঠিক করে ফেলে। এত তাড়াতাড়ি সব করলো যে বিয়ের বাজার করারই সময় নাই, সব কিছু তাড়াহুড়ো করে করতে হচ্ছে। আমি প্রীতম সাহেবকে বিয়ের কথা কল দিয়ে জানিয়ে দিয়েছি, সময় পেলে নিজে হাতে কার্ড দিয়ে আসবো। বিয়ের কথা শুনে প্রীতম সাহেব কনগ্রাচুলেট করলেন। আমি বললাম আপনি খুব খুশি হয়েছেন না? তখন উত্তরে এতটাই হাসতে হাসতে কথাগুলো বললেন যেটা উনার স্বভাবের সাথে বেমানান লাগলো, মনে হলো কোন কিছু লুকাতে বড় একটা অভিনয় করছেন।
ব্যস্ততার কারনে বেশি কথা বলা হচ্ছে না কয়দিন হলো, শুধু মাঝে মাঝে দুএক মিনিট কথা বলে খোঁজ নিয়েই রেখে দিচ্ছি, উনিও কি কিনলাম না কিনলাম আয়োজন কতদুর এসব দুএকটা প্রশ্ন করেন মাঝে মাঝে। কার্ড ছাপা হওয়ার সাথে সাথে আমি প্রথম কার্ডটা প্রীতম সাহেবকে দেবো বলে উনার বাসায় গেলাম। এই প্রথম উনার বাসায় আসলাম। পরী তো খুশিতে আত্মহারা আমাকে তাদের বাসায় আসা দেখে। কি থুয়ে কি দেখাবে আমাকে ভেবেই অস্থির। ওর সব খেলনা, জিনিস পত্র, কে কোনটা দিয়েছে কবে দিয়েছে সাথে এসব বর্ননাসহ আমাকে সব দেখালো।
প্রীতম সাহেব আমাকে আপ্যায়নে ব্যস্ত, কি খাওয়াবে কোথায় বসতে দেবে উনি যেন সেই চিন্তায় পাগল। আমি উনাকে থামিয়ে কার্ডটা হাতে দিয়ে বললাম আপনি পরীকে নিয়ে আগের দিন আমাদের বাসায় আসবেন এটা আমার আবদার। কোন অজুহাত চলবে না। আপনি না গেলে আমি বিয়ের পিঁড়িতেই বসবো না বলে দিলাম।
প্রীতম সাহেব কার্ডটা হাতে নিতেই মনটা কেমন মলিন হলো দেখলাম, তারপর কার্ড খুলে উল্টেপাল্টে দেখতে ব্যস্ত। আমি বললাম আমার কথাগুলো কি আপনার কানে গেলো জনাব?
একটু চমকে উঠে বললো হ্যা শুনেছি তবে আগের দিন হয়তো যেতে পারবো না, আর ঠিকও হবে না। অনেক মানুষ থাকবে বিয়ে বাড়িতে ঝামেলা হবে, আর আপনাকে এই ব্যস্ততার মধ্যে পরী খুব জ্বালাবে। বিয়ের আগের দিন কত কাজ আপনার, গায়ে হলুদ, মিষ্টি মুখ, আপনাকে এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হবে তার মধ্যে আমি চাইনা পরী গিয়ে ঝামেলা করুক।
আমি বললাম আমার কোন ঝামেলা হবে না, আমি পরীকে কোলে নিয়েই সব করতে চাই। আপনি আসবেন এটাই ফাইনাল, এত কিছু ভাবতে হবে না।
প্রীতম সাহেব খুব শান্ত গলায় বললেন প্লিজ জিদ করবেন না একটু ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখুন, আমি আপনাকে কথা দিলাম বিয়ের দিন ঠিক পরীকে নিয়ে যাবো আপনাকে দেখতে, বউয়ের সাজে আপনাকে কেমন লাগবে সেটা দেখবো না আমরা, সেটা কি হয়? আপনাকে বউয়ের সাজে দেখার অনেক সাধ আমার বলেই হাসলেন।
প্রীতম সাহেবের কথাটা আমার বুকের কোথাও এসে জোরে একটা ধাক্কা মারলো, দুএকটা বিট মনে হয় মিস করলো আমার হার্ট, গলাটা কেমন ধরে আসলো, চোখটাও ঝাপসা হয়ে গেলো। আমি মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে পরী কি করছে দেখতে লাগলাম। আচ্ছা প্রীতম সাহেবেরও কি এমন হলো? উনার চোখেও কি কুয়াশা জমলো? আমি দেখতে পারলাম না কারন আমার ঝাপসা চোখে তার চোখের দিকে তাকানোর সাহস পেলাম না।
কিছুক্ষন পর চলে আসতে চাইলে প্রীতম সাহেব শুধু বললেন এত তাড়াতাড়িই চলে যাবেন, আর একটু সময় থাকা যায় না?
আমি বললাম আসলে অনেক কাজ বাকি, এত অল্প সময়ে সব শেষ করা কঠিন হয়ে যাবে তাই এখনই যেতে হবে। কেন জানি আমারও আসতে মন চাইছে না, মনে হচ্ছে আরেকটু থেকে যাই কিন্তু এখান থেকে যত তাড়াতাড়ি পারি পালাতে পারলেই বাঁচি কারন আমার চোখটা কেমন জানি ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে বারবার, প্রীতম সাহেবের দিকে তাকাতে পারছি না আর কথা বলতেও কেমন গলাটায় আটকে যাচ্ছে।
আমাকে রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে আসলো প্রীতম সাহেব, আমি পরীকে কোলে নিয়ে আসলাম। একটা অটো করে দিলেন, পরী আমাকে একটা চুমু দিলো আমিও কপালে একটা চুমু দিয়ে বাবার কোলে দিলাম। প্রীতম সাহেবের দিকে তাকিয়ে বাই বলেই তাড়াতাড়ি অটোতে উঠে গেলাম কারন আমার চোখ দিয়ে জল বাহিরে টপ করে পড়ার জন্য রেডি হয়ে আছে যদি সেটা প্রীতম সাহেব দেখে ফেলেন সেই ভয়ে। অটোতে উঠেই কান্না আর আটকাতে পারলাম না, অনেক কান্না করলাম। জানিনা কেন আমার আজ এত কষ্ট হচ্ছে, চিৎকার করে কান্না করতে ইচ্ছে করছে। মনে হচ্ছে পুরো পৃথিবীটা অন্ধকারে ঢেকে আসছে, আমি যেন সব কিছু হারিয়ে ফেলছি, বুকের মধ্যে কেমন হাহাকার করছে, চারিদিকে সব শুন্য শুন্য লাগছে।
আচ্ছা প্রীতম সাহেব কি দেখতে পেয়েছেন আমার চোখের জলটা? তারও কি আমার মত এমন লাগছে?
#চলবে..
♥স্বপ্না’স খেয়াল♥

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.