নাবীলা আর নেই…..

Share On Social

ভাইয়া আমি মেলায় যাব! নাবীলা আজ আমার পরীক্ষা আছে, বিকালে নিয়ে যাব! না ভাইয়া আমি এক্ষুনি যাব!আমি রেডি হচ্ছি! নাবীলা আমি পরীক্ষাটা দিয়ে এসে তোমাকে বিকালে নিয়ে যাব! নাবীলা শুরু করে দিল কান্না কাটি। নাবীলা মেলায় যাবার জন্য কাঁদবে তা কখনই হয় না। নাবীলার কান্না ঘরের কেউ সহ্য করতে পারে না! আচ্ছা রেডি হও, নাবীলা! নাবীলা লাফাতে লাফাতে যায় রেডি হতে! অন্য রুম থেকে নাবীলা চিৎকার করে তার মেঝ ভাই সাহেদকে বলে…ভাইয়া আমি কি টপস পরবো নাকি শার্ট পরবো? সাহেদ হেসে উঠে বলে- তুমি টপস পর! ভাই-বোন দুইজনে রেডি হয়ে প্রাইভেট কার নিয়ে মেলায় চলে যায়! নাবীলা রোদের মধ্যে এদিকওদিক ঘুরে ঘুরে যা মন চায় তা কিনছে! খুশিতে আত্মহারা নাবীলা! ভাইয়া আমি বায়স্কোপ দেখবো! আচ্ছা দেখিও! নাবীলাকে বাহিরে দাঁড় করিয়ে সাহেদ টয়লেটে যায় আর অমনিতে নাবীলা বায়স্কোপ দেখতে চলে যায়! বায়স্কোপ আংকেল…বায়স্কোপ আংকেল আপনি আমাকে বায়স্কোপ দেখাবেন? আমার ভাইয়া আসলে আপনাকে অনেক টাকা দেবে! বায়স্কোপ ওয়ালার মায়া লেগেছে তাই বায়স্কোপ ওয়ালা নাবীলাকে বায়স্কোপ দেখায়! এদিকে নাবীলার মেঝ ভাই সাহেদ চারদিকে নাবীলাকে খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত প্রায়! কোথাও পায় না নাবীলাকে! মেলায় মাইকিং করে….নাবীলা নামের নয় বছরের একটি মেয়ে হারানো গিয়েছে, গায়ের রঙ ফর্সা, তার পরনে ছিল ব্লু কালারের টপস…. নাবীলা ততক্ষণে গেইট এর বাহিরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছে! একটা ছেলে নাবীলার হাত ধরে স্পিকারের সামনে নিয়ে আসে….নাবীলা নামের মেয়েটিকে পাওয়া গিয়েছে তার ভাই কিংবা বাবা কেউ এসে মেয়েটিকে নিয়ে যান! মেঝ ভাই সাহেদ দৌড়ে গিয়ে নাবীলাকে কোলে করে নিয়ে আসে!নাবীলার কিছু হলে তার বাবা-মা আর দুইভাই আগেই মারা যাবে! আশরাফ জামান চৌধুুরীর একমাত্র মেয়ে নাবীলা! দুই ভায়ের একটি মাত্র ছোট বোন! সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম নেয়ার মত তার অবস্থা! পুরো পরিবারের কলিজার টুকরা নাবীলা! দুই ভাইয়ের জন্মের অনেক বছর পর নাবীলার জন্ম!নাবীলার জন্ম দুবাইতে! অনেক কষ্টের বিনিময়ে নাবীলাকে আল্লাহ থেকে খুঁজে নিয়েছেন!আশরাফ জামান চৌধুরী আর মিসেস চৌধুরীর একমাত্র কষ্ট ছিল তাদের কোন কন্যা সন্তান নাই! মিসেস চৌধুরী কত রাত যে না ঘুমিয়ে কেদে কেদে আল্লাহ থেকে একটি কন্যা সন্তান ভিক্ষা চাইতেন একমাত্র তিনিই জানেন! এদের সব কিছু আছে তবু যেন কিছুই নেই! দুই ভাইয়ের জীবন ও যেন অপূর্ণ শুধু একটি বোনের অভাবে! আশরাফ জামান চৌধুরী আর উনার বড় ছেলে শাহীন চৌধুরী দুবাই বিজনেস করে! আশরাফ জামান চৌধুরী কোনো মার্কেটে গেলে ছোট ছোট মেয়ের কাপড় দেখলে দুই চোখ বেয়ে অশ্রু ঝড়ে পরে! সব কষ্ট অবসান ঘটিয়ে একদিন মিসেস চৌধুরীর কোলে আসে একটি ফুটফুটে কন্যা সন্তান যার নাম “নাবিলা জামান চৌধুরাণী” নাবিলা আসতে আসতে বড় হতে থাকে! সেই ছোট্ট মেয়ে নাবীলা এখন ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারে পড়তেছে! বাবা-মা আর দুটি ভাইয়ের কত স্বপ্ন নাবীলাকে নিয়ে! নাবীলা তার পরিবার থেকে মেঘ না চাইতে বৃষ্টি পেয়ে যায়! নাবীলার আব্বু আর বড় ভাই শাহিন চৌধুরী প্রতিদিন তাকে ভিডিও কলে একবার হলেও দেখবে !এটা যেন তাদের দুইজনের দৈনন্দিন রুটিন! পথ শিশুদের প্রতি নাবীলার অন্যরকম একটা টান আছে! কলেজে যাবার সময় পথ শিশুদের কে খাবার কিনে দেয়!তাদের কে আদর করে আরো কত কি! শিশুগুলোও নাবীলাকে অনেক ভালোবাসে! প্রতিবার রমজান মাসে নাবীলা পথ শিশুদের কে নিয়ে ইফতারির আয়োজন করে তাদের সাথে বসে এক সাথে ইফতারি করত! তাদের কে নতুন জামা কিনে দিতো! যারা লেখাপড়া করতে চাইতো তাদের পরিবার কে লেখাপড়ার খরচ দিতো! নাবীলার ভিতর সবসময় বাস করত একজন ভাল মানুষ! নাবীলার মাঝে পাওয়া যায় ভদ্র,নম্র বিনয়ী মহত্ববোধ! তার মধ্যে কোন অহংকার কাজ করত না! নাবীলার আব্বু আশরাফ জামান দেশে আসবেন তাই ফোন করে মেয়েকে জিজ্ঞাস করে….মা তোমার জন্য কি লাগবে? আব্বু আমার জন্য DSLR আনিও, আর কিছু ভাল থেকে চকলেট আনিও শিশুদের জন্য! মার্কটে গিয়ে আশরাফ জামান আগে মেয়ের জন্য DSLR ক্যামেরা নেয় বাংলাদেশ প্রাইজ সত্তর হাজার টাকা দিয়ে ! নাবিলা ক্যামেরা পেয়ে তো মহা খুশি! টেবিলে ভাত খেতে বসে নবিলা তার বাবা-মা আর মেঝ ভাই সাহেদ! হঠাৎ নাবিলা বলে উঠে… আচ্ছা আব্বু আমি মারা গেলে তোমরা কি আমাকে ভুলে যাবে ? নাবীলার এই কথা শুনে সবাই স্তব্ধ হয়ে যায়! নাবিলা আবার বলে…. আব্বু বল না.. তোমরা কি আমাকে ভুলে যাবে? নাবীলার আব্বু হুঁ হুঁ করে কেদে উঠে! মেঝ ভাই সাহেদ চোখ মুছতে মুছতে ভাতের টেবিল থেকে উঠে চলে যায়! নাবীলার মায়ের অশ্রু ভাতের প্লেটে পড়ে! আগামী পরশু নাবীলার ১৭ বছর পূর্ণ হবে। নাবিলার আব্বু নাবীলাকে ডেকে বলে আমার ছোট্ট সোনা বাবুর জন্য জন্মদিন উপলক্ষে কি করতে হবে? নাবীলা তার আব্বুকে বলে…আব্বু কিছুই করতে হবে না! কিছু পথশিশুদের জন্য ভাল ভাল খাবার রেডি করবে! বড় লোকেরা চারদিকে ভাল খাবার খেতে পারে কিন্তু পথশিশুরা তা খেতে পারে না! এদের কে কেউ ভাল খাবার দেয় না! নাবিলার কথা শুনে তার আব্বু অবাক হয়ে যায়!আমার ছোট্ট মেয়েটা দেখি এখন অনেক কিছুই বুঝে! হঠাৎ নাবিলা তিব্র মাথা ব্যথায় চিৎকার করতে থাকে! সাথে বমিও! ড্রাইভারকে তাড়াতাড়ি গাড়ী বের করতে বলে নাবীলাকে নিয়ে যায় ক্লিনিকে!ডাক্তার কিছু পরিক্ষা-নিরীক্ষা করে! সব রিপোর্ট নরমাল আসলে দুইদিন পর রিলিজ দিয়ে দেয়! বিশ দিন দেশে থেকে নাবীলার আব্বু জনাব আশরাফ জামান চৌধুরী দুবাই চলে যাবে আজ সন্ধ্যা সাতটায় ফ্লাইট! নাবীলা তার আব্বুকে জড়ায় ধরে বলে… আব্বু তুমি যদি আবার এসে আমাকে এখানে দেখতে না পাও তাহলে আকাশে আমাকে দেখতে পাবে! চাঁদের দক্ষিণ পাশে যে তারাটা মিটমিট করে জ্বলবে মনে করবে সেটা আমি! নাবীলার আব্বু নাবীলার মুখ চেপে ধরে গুমরে কেদে উঠে বলে…এমন অলক্ষনীয় কথা বলতে নেই মা!তোমার কিছু হবার আগে যেন আমার মরণ হয়! নাবীলার আব্বু বিদেশে থাকলেও মন পরে আছে মেয়ের দিকে! আমি আসার সময় মেয়েটা অমন করে বলছে কেন!টেনশন করতেছে মেয়ের জন্য! ফোন দেয় মেয়েকে…..নাবীলা মা কেমন আছ তুমি..? নাবীলা তার আব্বুকে বলে আচ্ছা আব্বু তুমি কি আমাকে অনেক লাভ কর?? হ্যাঁ! মা অনেক অনেক লাভ করি! আব্বু যখন আমি তোমাদের থেকে হারিয়ে যাব তখন তুমি ওই পথ শিশুদেরকে অনেক আদর করবে!তুমি যখন ওদের কে আদর করবে তখন মনে করবে ওরা আমার হয়ে তোমার সাথে কথা বলছে! আব্বু আমি বেঁচে থাকব তাদের মাঝে! মেয়ের কথা শুনে আশরাফ জামানের কলিজা মুচড় দিয়ে উঠে! নাবীলার ইন্টারমিডিয়েট এর ফার্স্ট ইয়ারের ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হবে আগামীকাল থেকে! নাবীলা মাথা ব্যথার জন্য ঠিকভাবে পড়তেও পারে না! প্রায় সময় মাথা ব্যথা করে কিন্তু বাসার কাউকে বলে না!নাবীলার একটু কিছু হলেই সবাই খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দেয় টেনশন করে!যতবার মাথা ব্যথা করে ততবার সে চুরি করে ব্যথার মেডিসিন নেয় ! নাবীলা পরীক্ষা দিতে যায়! ধুম করে পরীক্ষার হলে অজ্ঞান হয়ে পড়ে!টিচার নাবীলার ভাইয়াকে ফোন দেয়!ততক্ষণে এরা নাবীলাকে ক্লিনিকে ভর্তি করে দেয়!নাবীলাকে ছয় দিন CCU তে রেখে নাবীলার গার্জিয়ানকে বলে ঢাকায় নিয়ে যেতে!বিমানে করে নাবীলাকে ঢাকায় নিয়ে যায়! ঢাকায় নাবীলাকে পরীক্ষা করে রিপোর্ট দেয় নাবীলার ব্রেন টিউমার!দ্রুত অপারেশন করা লাগবে নাহলে নাবীলাকে বাঁচানো যাবে না! পাগল হয়ে যায় নাবীলার মা-বাবা আর দুইভাই! নাবীলার ভাই প্রত্যেক মসজিদ আর মাদ্রাসায় নাবীলার নামে টাকা দেয়। তার মা দিন রাত জায়নামাজে বসে থাকে! নাবীলাকে সিঙ্গাপুর নিয়ে যায়!সিঙ্গাপুর ডাক্তার পরীক্ষানিরীক্ষা করে ডাক্তার তার ভাইকে রিপোর্ট দেয় যে তার ব্রেন ক্যানসার! সাথে সাথে মেঝ ভাই সাহেদ অজ্ঞান হয়ে যায়! জ্ঞান ফিরলে দেয়ালের সাথে মাথা বারি মারে!!নাবীলার মায়ের হাত-পা ঠান্ডা!বার বার অজ্ঞান হয়ে যায়! জ্ঞান ফিরলে নাবীলা নাবীলা বলে পাগলের মত ক্লিনিকে ক্লিনিকে দৌড়তে থাকে! দেশে নিয়ে আসে নাবীলাকে! নাবীলার আব্বু মেয়েকে দেখতে দেশে আসবে তাই প্রতি বারের মত মেয়েকে ফোন করে জিজ্ঞাস করে… মা তোমার জন্য কি আনব…নাবীলা বলে আব্বু, আমি যা বলি সব আনবে তো..? নাবীলার আব্বু বলে… আমার মেয়ে যা চায় সব নিয়ে আসব! নাবীলা বলে…আব্বু পথ শিশুদের জন্য ভাল থেকে কাপড় নিয়ে আসিও!এরা বিদেশি কাপড় কখনই পরেতে পারেনি!আব্বু আমি নিজ হাতে তাদের কে পরিয়ে দেবো! নাবীলা যা বলেছে নাবীলার আব্বু সব নিয়ে আসছে নাবীলার জন্য! এদিকে আসতে আসতে নাবিলার দেহ নিস্তেজ হয়ে আসতেছে!নাবীলার আব্বুর ফ্লাইট বাংলাদেশে ল্যান্ড করে!ল্যান্ড করার সাথে সাথে উনার ফোনে একটা কল আসে…. নাবীলা আর নাই………!!
.
Facebook Post Link

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.