দিক পাশ (৩য় পর্ব)

Share On Social

ঢুকেই আন্টি আন্টি বলে ডাকা শুরু করলাম।নিবিতা বিরক্ত অবাক দুটোই।নিবিতার মা ভেতরের ঘর থেকে বের হয়ে এলো, -“কে বাবা তুমি?” -“আন্টি চিনতে পারছেন না? আমি অনয়। নিবিতার কলেজের সিনিয়র ব্যাচ ছিলাম, আপনারা যখন কুষ্টিয়ারর বাড়িতে থাকতেন বড়ই খেতে আসতাম গাছের। মনে আছে?” -“ও….আরে প্রায় ৫ বছরের গ্যাপ বাবা! কত বড় হয়ে গেছো! তখন তো ক্লিন শেভ ছিলে তাই চিনতে পারিনি। তা হঠাৎ…. কি করে আমাদের খুঁজে পেলে?” আমি সব কিছু খুলে বললাম, সঙ্গে ওর গিটারের তারের কথাটাও। ? ও রেগে টমেটো হয়ে আছে,এদিকে আন্টি আমাকে জামাই আদর করে খাওয়াতে লাগলো। আমি জোড় পূর্বক গিটারের তার ঠিক করে দিলাম। আসার সময় ও আর দেখা করেনি, আমি বিদায় নিয়ে চলে এলাম। কাজের চাপে দিন যাচ্ছিলো, আমি তেমন সুযোগ পাচ্ছিলাম না বাইরে বের হতে। শুক্রবার বিকেলে বাইকে নিয়ে বের হলাম একাই, উদ্দেশ্য উত্তরার দিকে ঘুরে আসা। ভাবলাম কিছু ন্যাচারাল ফটোশুট করবো, বাইক পার্ক করে বেড়িয়ে পরলাম ক্যামেরা হাতে। সখের জিনিস করতে খারাপ লাগে না। ক্লিক করছিলাম কিছু দৃশ্য, হঠাৎ কালো কাঁচের চুড়ির হাত গাছের গায়ে ধরে আছে, লেন্সে ধরা পরলো! আমি দেরি না করে ক্লিক করে ফেললাম।মেয়েটা বেশ দূরে, সাইড থেকে কয়েকটা ছবি নিলাম যদিও এটা অন্যায় ছিলো দারুন লাগছিলো ছবিগুলো! ফলো করে এগিয়ে গেলাম কিন্তু ততক্ষণে মেয়েটা চলে গেছে,মুখটাই দেখা হলো না। বাড়ি ফিরে ছবিগুলো ল্যপটপে নিয়ে দেখছিলাম, মেয়ের ছবিগুলো অসাধারণ এসেছে। একটা ছবি ইডিট করে ফেসবুকে পোস্ট করলাম। ক্যপশন – “অচেনা কন্যার প্রেমে পরেছি?” ঠিক ২০ মিনিট পরই ম্যসেজ এলো নিবিতার! -“হাউ ডেয়ার ইউ! আপনি কোন সাহসে আমার ছবি তুলেছেন? আবার সেটা পোস্টও করে দিয়েছেন! আমার পিছু করছেন কেনো? এখন এসব আদিখ্যেতার কি দরকার? এখন লজ্জা করে না গেঁয়ো ভুতের পিছু নিতে?” -“ওয়েট! তোমার ছবি মানে! এটা কি তুমি?!” -জ্বী হ্যাঁ।(সেলফি পিক পাঠালো সে যায়গার) -“ওফ! সো সরি। এটা যে তুমি আমি দেখিনি ছবি তুলতে তুলতে এ মেয়ের ছবি তুলেছি,চেহারা দেখিনি।” -“ছবি ডিলিট করুন, এত কথা শুনতে চাই নি।” আমি অবাক হলাম ওর ছবি দেখে,ওর ছবিটাই কেন আমার তোলা হলো? দুনিয়ায় আর কোনো মেয়ে ছিলো না ?। ছবিটা ডিলিট করলাম না অনলি মি করে রাখলাম। মেয়েটা এত বছর পরও এমন ক্ষেপে আছে! আসুন ঘটনাটার স্মৃতিচারণ করি- আমার বাবার তখন পোস্টিং ছিলো কুষ্টিয়ায়। আমরাও ওখানে, আমি ছেলেবেলা থেকেই ডানপিটে স্বভাবের, আউটলুক ভালো থাকায় জীবনে অনেক মেয়ের মন ভেঙ্গেছি। আমি যখন অনার্স ফাইনাল ইয়ারে নিবিতা মাত্র ইন্টারের ছাত্রী। ওর কটেজটা আমাদের এরিয়ায়ই ছিলো, ওর আসা-যাওয়া সব কিছুই চোখের সামনে।প্রায়ই আমরা ওদের কটেজের সামনের বড়ই গাছ থেকে বড়ই খেতাম, বারোমাসি বড়ই। ওরা আসার পরও চুরি করে খেতে যেতাম, একদিন ধরা পরে যাই নিবিতার সামনে! মোটা কালো একটা মেয়ে তেলে চুপচুপে মাথার কোকড়ানো চুলের বেণী! ও ফ্যলফ্যল করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে,আমি ওর হাতটা ধরে কিছু বড়ই দিয়ে বললাম, -“কাউকে বলো না প্লিজ।” সঙ্গে সঙ্গে ওমনি দৌড়, এরপর দুদিন আর সেখানে যাই নি। কলেজ ক্যন্টিনে বসে একদিন আমরা চা খাচ্ছিলাম নিবিতা আমার সামনে এসে কাগজের ঠোন্গায় কিছু বড়ই আর বিট লবন দিয়ে বলল, -“আপনার জন্য রেখেছিলাম আপনি আর যান নি,তাই নিয়ে এসেছি।” আমি হেসে দিয়ে বললাম- “চোরকে নিজেই সম্পত্তি দিয়ে দিলে?” ও হেসে চলে যাচ্ছিলো, আমি পেছন থেকে ডাক দিলাম- “এইযে পিচ্চি, তোমার নাম কি?” -“আমি পিচ্চি না,আমি নিবিতা।” -“ওকে নিবি ভালো থেকো।” ও হেসে ওখান থেকে চলে আসলো, এরপর থেকে আমাকে আর বড়ই তেমন পারতে হতো না। ওই পেরে রাখতো আমরা সবাই গেলে দিয়ে দিতো। ওর মা ও আমাদের ওর কলেজের বন্ধু হিসেবে আপ্যায়ন করতো। আমার বন্ধুরা ওকে “ডিবি” ডাকতো,আর ও ডিবি ভরে ভরে খাবাও আনতো। চলছিলো ভালোই, এর মধ্যেই একটা সুন্দরী মেয়ে আমাদের কলেজে পদার্পণ করলো?। নিবিতার ক্লাসের! সোনায় সোহাগা আমি,নিবিতাকে বললেই পটানো যাবে। আমাকে আর পটাতে হয় নি মেয়েটা নিজে থেকেই পটে গেলো, আসা যাওয়ার সময় খুনসুটি, চোখের কোনে দুষ্টুমি চলতে লাগলো। আমরা ঘুরতে যেতাম নৌকায় বেশির ভাগ সময়, ওকে নিয়ে এতটাই মত্ত ছিলাম নিবিতাদের কটেজের বড়ই খাওয়া হয় নি। ২ মাস নিবিতার কোনো খোঁজ ছিলো না।ব্যপারটা আমি খেয়ালই করিনি,ও হঠাৎ একদিন ক্যন্টিনে এলো! চোখদুটো কেমন রোগা, কালি পরে গেছে। আমি সিট ছেড়ে উঠে দাড়াতেই ও আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে লাগলো।আমি হতবাক হয়ে -“নিবি কি হয়েছে?” ও অঝড়ে কেঁদেই যাচ্ছে, আমি ওকে বসালাম চেয়ারে, -“কোনো সমস্যা হয়েছে বলো আমাকে?” ও আমার হাত ধরে বলতে লাগলো, -“অনয়, আমি অনেক চেষ্টা করেছি তোমাকে ভুলে থাকার। আমি পারিনি,তুমি ফারিয়ার সঙ্গে ঘুরে বেড়াও আমি সহ্য করতে পারি না। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। আমাকে তুমি ফিরিয়ে দিয়ো না।” আমি ছিটকে ওর হাতটা ছেড়ে দিলাম, -“তোমার সাহস কত বড়! নিজেকে আয়নায় দেখেছো? তোমার সঙ্গে আমাকে যায়? আরে হেসে কথা বললেই কি সুযোগ পেয়ে যাও।তোমার মতো মেয়েগুলা আসলে কাউকে পায় না তো তাই ভালো আচরণ করলেই সুযোগ নিতে চাও, গেঁয়ো কোথাকার।ভুলেও আর ন্যকামি করতে আসবা না আমার সামনে, ফারিয়ার নখের যোগ্যতাও তোমার নেই, এসেছে ভালোবাসতে!” এরপর ও আর কখনো আমার সামনে আসেনি, আমিও ওদের ওখানে যাওয়া ছেড়ে দিলাম কারণ ফাইনাল পরিক্ষা, জব খোঁজাখুজি তে ব্যস্ত এরপর বাবার রিটায়ারমেন্টের পর ঢাকা নিজের বাড়িতে এসে উঠলাম,ভুলেই গেছিলাম সব। কতশত ফারিয়া এলো গেলো এতদিনে,ওর কথা স্মৃতিতেই ছিলো না। চলবে….

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.