“অতঃপর ভালোবাসা সুপ্তি” একটি ভালোবাসার গল্প

কাল ফ্রি আছো?

সুপ্তির কথায় আমি কিছুক্ষন চুপ করে রইলাম।আসলে বোঝার চেষ্টা করছিলাম ও কি আমাকে আবার কোথাও নিয়ে যাবে নাকি।
এইতো সেদিনের কথা।ঘুমুচ্ছিলাম,তখনি সুপ্তির ফোন এসে হাজির।আমি ফোনটা ধরতেই সুপ্তি বললো,
-পাচ মিনিটের মধ্যে নিচে এসো।
কথাটি বলেই সুপ্তি ফোনটা কেটে দিল।কিন্তু কিসের জন্যে সেটাইই জানা হলো না।

সুপ্তি আমাদের পাশের ফ্লাটেই থাকে।বেশ লক্ষী একটা মেয়ে।দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি রাগটাও একটু বেশী।কত বার যে ওকে প্রপোজ করতে গিয়ে ফিরে এসেছি সে হিসাবই নেই।
সেদিন তো উপর তলার একটা ছেলেকে আচ্ছা মত মেরেছিল।আমি গিয়ে যদি না ছাড়িয়ে দিতাম তাহলে তো একদম মেরেই ফেলতো।তবে এত মারের কারন তখন না জানলেও পরে শুনেছিলাম,ছেলেটা নাকি ওকে প্রপোজ করেছিল।কি ডেঞ্জারাস মেয়ে।আরে প্রেম করবি না বলে দিলেই তো হয় এত রাগের কি আছে।

আমি ফ্রেশ হয়ে নিচে আসতেই দেখি সুপ্তি দাঁড়িয়ে। আমি ওর সামনে গিয়ে দাড়াতেই সুপ্তি বললো,
-আজ কি অফিস আছে?
-না,নেই।
-চলো।
সুপ্তির কথায় আমি আর কিছু না বলে বাধ্য ছেলের মত রিক্সায় চেপে বসলাম।আসলে কি বলি আর কি করে আল্লাহই জানে।তার চেয়ে চুপচাপ ওর কথা শোনা ঢের ভাল।তবুও ও ওকে কাছে থেকে দেখতে পাচ্ছি এটাই অনেক।

রিক্সা এসে থামলো সুপ্তির ভার্সিটির সামনে। এখানে কেন আসলো ঠিক বুঝতে পারলাম না।ও ক্লাস করবে আর আমি বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবো নাকি।
রিক্সা থেকে নামতেই সুপ্তি আমার হাত ধরে ভেতরে ঢুকলো।এই প্রথম ও আমার হাত ধরেছে।কত বার চেয়েছি শুধু একটু স্পর্শ করতে,কিন্তু পারিনি।আজ সেটা না চাইতেই পেয়ে গেলাম।
সুপ্তি আমাকে নিয়ে কয়েকটা ছেলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। দেখে তো মনে হচ্ছে ছেলেগুলা আমার ছোটই হবে।কিন্তু ওদের সাথে আবার কি।
আমি কিছু বলার আগেই সুপ্তি একটা ছেলেকে ডাক দিয়ে বললো,
-জামিল,ও হচ্ছে আহাদ।আমার বয়ফ্রেন্ড।তুমি দেখতে চেয়েছিলে তাই দেখালাম।আশা করি আর আমার পেছনে ঘুরে সময় নষ্ট করবে না।
কথাটি বলেই সুপ্তি আমাকে সেই আগের মতই হাতটা শক্ত করে ধরে বাইরে নিয়ে এলো।কিন্তু ও এটা কি বললো।আমি ওর বয়ফ্রেন্ড!
রিক্সায় বসতেই আমি সুপ্তিকে বললাম,
-এইটা কি হলো?
-কিছুদিন হলো ছেলেটা আমাকে বিরক্ত করছিল।তাই গতকাল বলেছিলাম আমার বয়ফ্রেন্ড আছে।
-আমি কি তোমার বয়ফ্রেন্ড?
আমার কথায় সুপ্তি আমার দিকে কেমন করে যেন তাকালো।ভুল কিছু বললাম নাকি।সুপ্তি কিছুক্ষন চুপ থেকে বললো,
-আসলে আমার কোন বয়ফ্রেন্ড নেই।ওদের শুধু দেখানোর জন্যেই তোমাকে নিয়ে গিয়েছিলাম।
-সত্যি হলে বেশ হতো।
-কিছু বললে?
-কোই না তো।উফ বাবা তবুও শোনেনি।শুনলে কি ও আমাকে রিক্সা থেকে নামিয়ে দিত নাকি থাপ্পর দিত।আমি আর কিছু বললাম না।সেদিন ভালভাবেই বাসায় এসেছিলাম।

আমার চুপ থাকা দেখে সুপ্তি আবার ও বললো,
-ফ্রি না থাকলেও ফ্রি হবা,বিকেল পাচটায় বাসার নিচে তোমার জন্যে অপেক্ষা করবো।
এবারও সুপ্তি আমাকে কিছু বলতে না দিয়ে ফোনটা কেটে দিল।কাল যে আবার কাকে দেখাতে নিয়ে যায় সেটাই ভাবনার বিষয়।যাই হোক, আপাতত ঘুমটা তো হয়ে যাক।

অফিস থেকে বের হতেই প্রায় সাড়ে চারটা বেজে গেলো।যেভাবেই হোক এই আধ ঘন্টার মধ্যে অন্তত বাসার নিচে পৌছাতেই হবে।মেয়েটা যে রাগি।একটু দেড়ি হলে আবার কি করে বসে কে জানে।আসলে ভালবাসার মানুষের সবকিছুই কেমন যেন ভাল লাগে।সুপ্তির রাগটাও আমি বেশ উপভোগ করি।
আমি আর দেড়ি না করে রিক্সায় চেপে বসলাম।বাসায় পৌছাতে না পারলেও অন্তত বাসার নিচে তো যেতে হবে।

দুই মিনিট লেট।

সুপ্তির কথায় আমি কিছু বললাম না।আসলে রিক্সা থেকে নামতেই দেখি সুপ্তি দাঁড়িয়ে। আমি ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখি পাচটা বেজে দুই মিনিট।ভাড়াটা দিয়ে সুপ্তির সামনে আসতেই সুপ্তি কথাটা বললো।
আমার চুপ থাকা দেখে সুপ্তি আবার ও বললো,
-পাচ মিনিট সময় দিলাম,যাও ফ্রেশ হয়ে আসো।
-না লাগবে না,বলো কোথায় যাবে?
-বলছি না ফ্রেশ হয়ে আসতে।
সুপ্তির রাগি মুখ দেখে আমি বেশ ভয়ই পেলাম।কিছু না বলে ফ্রেশ হওয়ার জন্যে গেইট দিয়ে ঢুকতেই সুপ্তি বললো,
-কালো শার্টটা পড়ে এসো।
সুপ্তির কথায় আমি মাথা নাড়িয়ে চলে এলাম।উফ মেয়েটা এত রাগী কেন।আর আমার যে কালো শার্ট আছে এইটা ও কিভাবে জানলো।ও কি দেখেছে কখনও।আমি আর কিছু না ভেবে ফ্রেশ হয়ে ওর কালো শার্টটা পড়েই নিচে আসলাম।মেয়েটা এখনও ওখানেই দাঁড়িয়ে আছে।আমি সুপ্তির পাশে এসে বললাম,
-হুম চলো।
-পারফিউম লাগাও নি?
-আসলে,,,,
-আসলে কি?
-পারফিউম লাগালে তোমার শরীরের গন্ধটা পেতাম না।তাই লাগাইনি।
-আমার পারফিউম ভাল লাগে?নেবে?
-আমার লাগবে না।তোমার পারফিউম আমার শরীরে না,তোমার শরীরের ভাল লাগে।আমার বেশ লাগে।
আমার কথায় সুপ্তি মনে হয় একটু লজ্জাই পেলো।ও আর কিছু না বলে রিক্সায় চড়ে বসলো।আমিও ওর গা ঘেষেই বসলাম।গন্ধটা বেশ কাছে থেকেই পাওয়া যাবে।

রিক্সা এসে থামলো একটা শপিং মলের সামনে।বেশ বড় শপিংমলটা।আসলে এখানে এর আগে আসা হয়নি।সবকিছুর দাম বেশ চড়া।সুপ্তি কি আমাকে নিয়ে শপিং এ আসলো নাকি।ও তাহলে এখানেই শপিং করে।বাবার একমাত্র মেয়ে বলে কথা।

এদিকে আসো তো।

বেশ বড় শপিংমলটা।তাই একটু ঘুরে দেখছিলাম। তখনি সুপ্তি ডাক দিল।আমি সুপ্তির কাছে যেতেই দেখি মেয়েটা একটা শার্ট হাতে দাঁড়িয়ে আছে।আমি কিছু বলার আগেই সুপ্তি বললো,
-এইটা কেমন?
-হুম বেশ ভালই।কার জন্যে?
-সেটা তোমাকে ভাবতে হবে না।শুধু পছন্দ করো।
সুপ্তির কথায় আমি আর কিছু বললাম না।দুটো শার্টের সাথে দুটো প্যান্ট।এরপর আমার পায়ের মাপেই জুতো কিনলো।ওর ভাইয়ের জন্যে হয়তো কিনছে।উনি কি দেখতে আমার মতই নাকি।নাকি সাইজ একই বুঝলাম না।বড়লোকদের ব্যাপার স্যাপার না বোঝাই ভাল।
-তুমি দাড়াও আমি আসছি।
সুপ্তির কথায় আমি দাঁড়িয়ে আসপাশটা দেখছিলাম।মেয়েটা কোথায় যে গেলো।এদিকে শরীরটাও ভাল লাগছে না।কার না কার জন্যে শপিং করলো আর আমাকে খাটতে হলো গাধার মত।বাসায় গিয়ে বিশাল একটা ঘুম দিতে হবে।

চলো।

সুপ্তির কথায় আমি ওর দিকে তাকালাম।হাতে বেশ কয়েকটা ব্যাগ।আমাকে দিয়ে কি এখন ব্যাগ টানাবে!
নাহ সেটা আর হলো না।সুপ্তি নিজেই ব্যাগগুলা নিয়ে বেরিয়ে আসলো।
সন্ধ্যা গড়িয়ে প্রায় রাত হয়ে গেছে।আমি সুপ্তির পেছন পেছন বের হতেই সুপ্তি বললো,
-আমার সাথে একটু হাটবে?
সুপ্তির কথায় আমি ওর চোখের দিকে তাকালাম।কেমন যেন অন্য রকম লাগছে মেয়েটাকে।আমি বললাম,
-হুম চলো।

এই রাস্তাটা সন্ধার পর বেশ ফাকাই থাকে।মাঝে মাঝে দু একটা গাড়ির শব্দ শোনা যায়।সুপ্তির সাথে হাটতে বেশ লাগছে।ইচ্ছে হচ্ছে ওর হাত ধরে হাটি।কিন্তু মেয়েটা যে রাগি, হাত ধরলে আবার কি না কি করে বসে সেটা ভেবেই গলা শুকিয়ে গেলো।
সুপ্তির হাত না ধরলেও হাটার সময় ওর হাতের সাথে আমার হাত ঠিকই স্পর্শ হচ্ছে।সোডিয়ামের আলোতে সুপ্তিকে দেখতে একদম অন্য রকম লাগছে।মনে হচ্ছে দুনিয়ার সব মায়া ওর মুখে ঢেলে দেওয়া হয়েছে।

বসবো।

সুপ্তির কথায় সামনের বেঞ্চে বসে পড়লাম।বেশ খানিক্ষন হাটলাম।সুপ্তি পাশে থাকলে এরকম হাজার মাইল পথ হেটেই পার করে দেবো।
আমি সুপ্তির দিকে তাকিয়ে দেখি মেয়েটা একটু ঘেমে গেছে।আমি পকেট থেকে টিস্যু বের করে সুপ্তির মুখের ঘাম মুছে দিতেই ও আমার হাত ধরে বললো,
-এভাবেই সারাটাজীবন পাশে থাকবে তো আমার।
সুপ্তির এমন কথায় আমি একটু অবাকই হলাম।সুপ্তি এবার আমাকে আরও একটু অবাক করে দিয়ে ওর হাতে রাখা ব্যাগগুলা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
-এগুলা তোমার জন্যে।
-আমার জন্যে মানে।
-তুমি যেন কাল কি স্ট্যাটাস দিয়েছিলে?
সুপ্তির কথায় আমি কালকের স্ট্যাটাস মনে করার চেষ্টা করলাম।হ্যা কাল ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম।
-আজ যদি একটা গফ থাকতো তাহলে ঈদের শপিংটা সেই করে দিত।
সুপ্তি এবার আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
-এরকম স্ট্যাটাস আর কোন দিন দিবা না।
-তাহলে কি রকম স্ট্যাটাস দেবো?
-শপিং শেষে সোডিয়ামের আলোতে বউকে নিয়ে হাটতে বেশ লাগে,এরকম।
সুপ্তি কথাটি বলেই লজ্জায় মাথা নিচু করলো।আমি সুপ্তির মাথাটা তুলে ওর কপালে একটা চুমু একে দিয়ে বললাম,
-বিয়ের আগেই বউ।
সুপ্তি মুচকি হেসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
-হতে কতক্ষন।
হুম সেটাই তো। হতে কতক্ষন।আমি এবার সুপ্তিকে একটু শক্ত করেই জড়িয়ে ধরলাম,আর মনে মনে বললাম,
অবশেষে পাইলাম,আমি উহাকেই পাইলাম।

1 thought on ““অতঃপর ভালোবাসা সুপ্তি” একটি ভালোবাসার গল্প”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.