নিরাপদ সড়ক আন্দোলন নিয়ে কিছু দারুন কথা।

Share On Social

নিরাপদ সড়ক আন্দোলন নিয়ে কটা কথা বলার ছিলো। কথার পাশাপাশি ছবিও জুড়ে দিয়েছি। কারণ একটা ছবি হাজারগুণ ভালো বুঝাতে পারে বাংলা লেখার চেয়ে।
.
ফ্যাক্ট ১: ছাত্ররা সতেরোজন পুলিশভর্তি একটা গাড়ি আটকানোর পর দেখে যে ঐ গাড়ির চালকেরই কোনো লাইসেন্স নেই, সাথে সাথে গাড়ি আটকে দেয়। আরেক পুলিশ হোন্ডাতে ছিলেন, ভুয়া কাগজ দেখালে ছাত্ররা বলে উঠে- “স্যার, আমরা লেখাপড়া জানি!” ❤
আনসার বা বিজিবির একটা বাস আটকে দেয়া হয়ে গায়ে লিখে দেয়া হয় “লাইসেন্স নাই।”
.
বাদ যায়নি সরকারি গাড়িও। সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে যুক্ত একটা গাড়ির লাইসেন্স না থাকায় চাবি নিয়ে নেয়া হয়েছে। ইভেন সংবাদ কভার করতে আসা অনেক সাংবাদিকও টিভি চ্যানেলের গাড়ি নিয়ে ঢুকতে পারেননি, কারণ একই। ঐ লাইসেন্সটা নেই বলে।
.
আর সম্ভবত মাননীয় মন্ত্রী তোফায়েল আহেমেদেরও একই দশা! উল্টোপথে গাড়ি, অতঃপর পুশব্যাক।
.
কথা হলো- একটা দেশ তখনই লাইনে আসে, যখন সবধরণের মানুষ একই লাইনে চলে। সবার জন্যে একই আইন এটাই ডেমোক্রেসির ভাষা। ❤
আজ স্কুলকলেজের ছেলেরা যেভাবে মন্ত্রী, পুলিশ, আনসার, সাংবাদিক ইত্যাদি ভিআইপি কোটার লোকজনকে সাধারণ আইনের লাইনে নিয়ে আসছে, এটা গত চল্লিশ বছরেও হয়েছে কিনা সন্দেহ।
.
লাইসেন্স নেই? দ্যান ইউ আর আউট!
“নো পক্ষপাতিত্ব”
আই রিপিট, “নো পক্ষপাতিত্ব”।
.

ফ্যাক্ট ২: ধানমন্ডী রোড নং ১, আরংয়ের গলি নামে পরিচিত রাস্তাটা প্রায়সময়ই জ্যামে ঢাকা থাকে, ট্রাফিক রুল মানার কোনো নিয়মকানুন নাই। কাল আন্দোলনরত স্কুলকলেজের কিছু শিক্ষার্থী দায়িত্ব নিয়ে কিছুসময়ের মাঝেই পুরো সিস্টেম ঠিক করে ফেলে, পুরো রাস্তা ডিভাইড হয়ে যায় আসা যাওয়ার দু লেনে, মাঝে আবার প্রায় দেড় মিটার ফাঁকা জায়গা।
.
যদিও গাড়িসব দাড়িয়ে ছিলো, এমারজেন্সি, অ্যাম্বুলেন্স যেতে কোনো বাঁধা দেয়া হয়নি, উল্টো সাহায্য করা হয়েছে। স্থানীয় লোকের দাবি, তাঁরা গত বারো বছরেও এতো সুষ্ঠু নিয়মপালন হতে দেখেননাই।
.
এটা জাস্ট একটা উদাহরণ। পুরো দেশে আরো শতশত উদাহরণ আছে। চট্টলায় দুই নংয়েও একই সিস্টেম চেন্জ। ওয়াসাতেও হচ্ছে।
.
কথা হলো, যারা ট্রাফিক পুলিশরা যেটা বছরের পর বছর ধরে ট্রাই করেও পারেনি তা ঘন্টার ভেতর করে দিলো, সেসকল ছাত্রদের কাছ থেকে ট্রাফিক অথোরিটির ক্লাস নেয়া দরকার কিনা।
অবশ্য তা আর হওয়ার জো কই। বিচারের বদলে ঘুষ নিয়ে আর ভুয়া লাইসেন্স দিয়ে পুরা সিস্টেমটাই পাবলিক টয়লেট করে ফেলেছে এরা।
.

ফ্যাক্ট ৩: অনেকে বলেছেন ছাত্ররা হয়রানি করছে, জ্যাম লাগিয়ে দিচ্ছে। কথাটা হলো, ছাত্ররা ইমারজেন্সির গাড়ি, রোগীর এম্বুলেন্স ঘুণাক্ষরেও আটকায়নি। তারা রাজনীতিবিদ না, মানুষ। মনুষ্যত্ব আছে।
.

এক মহিলার বাচ্চা অসুস্থ, সব ছাত্র মিলে তাঁর রিকশাকে জায়গা করে দিয়েছে। এম্বুলেন্সের সাইরেন শুনেই পথ দেখিয়ে দিয়েছে। এসব ছেলেরা মূর্খ না, ফাইভসিক্স পাস করে পলিটিক্সের জোড়ে এমপি-মেয়র হয়নাই এরা। সুতরাং ন্যূনতম কমনসেন্স আছে, যা আবার অনেক মন্ত্রীরও নেই।
.
ফ্যাক্ট ৪- অনেকের দাবী, ছাত্রদের মুখের ভাষা ঠিক না। এটা আমিও মানি। বর্তমান ইয়াং জেনারেশন দুইকদম আগাতেই তিনবার ‘ফাক ইউ’ বলে (এবং আমরা নিজেরাও ইয়াং জেনারেশানের বাইরে নই!)। তারপরো মোদ্দা কথা হলো, মাথায় রক্ত উঠলে মুখ দিয়ে আগুনই বের হবে, মিষ্টি না! 🙂
.
নিজের ভাইবোন সহপাঠীদের রাস্তায় পড়ে মরতে দেখেছে তারা, আপাতত বাংলা ব্যাকরণ ও ভাষার সুশীলতার লেকচারটা তাই থাক। এদেশে পলিটিশিয়ানরাও কিন্তু টকশোতে এসে গালি দেয়, আম্লীগ বিম্পি দুটাই, সুতরাং ছাত্রদের দোষ ধরতে গেলে আগে বুড়া ঘাটের মড়াগুলোকেও ধরতে হবে।
.
তাছাড়া, স্টুডেন্টদের ভাষাবিকৃতি নিয়ে পোস্টানো লোকগুলো নিজে দিনে কয়বার মুখে স্ল্যাং ইউজ করে তা গুণতে গেলে ক্যালকুলেটরই শাট ডাউন হয়ে যাবে।
.
আগে এটলিস্ট একটা খুনীর বিচার হোক, তারপর না হয় করা যাবে ভাষা নিয়ে সুশীলতা।
.

ফ্যাক্ট ৫: মন্ত্রী শাহজাহান খান সেদিন হেসেছিলেন, ভারত টেনেছিলেন (অবশ্য এদেশের পলিটিশিয়ানরা কথায় কথায় ভারতকে টানে, টেনে টেনে চুষে চুষে মজা পায়)। আজ আবার তিনি কাঁদলেন, দিয়ার বাসায় গিয়ে মাথায় হাত বুলালেন।
কিন্তু সমস্যাটা হলো বাঙালিরা মোম না, এরা সহজে গলেনা।
Politics আর Poly-Tricks এর সম্পর্ক টা এরা ভালো বুঝে। তাই নৌমন্ত্রীর হাসিক্ষমার ট্রিক গুলো আপাতত মাঠে মারা যাচ্ছে।
.
ফ্যাক্ট ৬: বেশ কয়েকটা ছবিতে দেখলাম, পুলিশ ছাত্রদের গায়ে হাত তুলছে। দুজনকে পিটাতে দেখলাম, একজন দেখলাম স্কুলের মেয়ে একটাকে ধরতে দৌড়াচ্ছে, তাও আবার তিন স্টারের পুলিশ। ছাত্রীটা ওর মেয়ের বয়সীই, তবুও মাফ নাই। আইন রক্ষার দায়িত্ব বলে কথা।
.
কথা হলো, পুলিশের এহেন ব্যবহার দেখে যারা হাহুতাশ করছেন, কটুকথা বলছেন তাদের বলি, আপনাদের এত সাহস কেমনে হয় পুলিশের কাছ থেকে ভালো কিছু এক্সপেক্ট করা?
.
পুলিশ মাত্রই কামড়াবে, ঘেউ করবে, স্ল্যাংগাবে তুইতোকারি চলবে, সাথে উপর মহলের তাবেঁদারি আর পকেটে থাকবে লাইসেন্স বেচা ঘুষ। তবেই না হবে আসল পুলিশ!
পকেটে ইয়াবা/উইড ঢুকিয়ে ছাত্রদের হয়রানি করে টাকা আদায় করা, রিকশা আটকে কাপলকে হয়রানি করা রিয়েল জুয়েল পুলিশ এরা! 🙂
.
তাই ভুলেও ভালো কিছু ভাববেননা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যা করছে, ভালোই করছে, আইন সামলাচ্ছে। যেমন ভাবে ওরা বড় বড় খুনীদের ক্ষেত্রে আইন বিচারের ব্যাপারগুলো সুন্দর ভাবে সামলে যায়, এড়িয়ে যায়, মানিব্যাগটা মোটাতাজা করে, সেভাবে।
.
ফ্যাক্ট ৭: মোটিভেশন স্পেশালিষ্ট সুখ-অন আর মিস্টার টেনমিনিট স্কুল দৌড়ের ওপর আছেন! সুখ-অন থেকে কখনো সুখ খুঁজিনি যদিও, তবে পার্সোনালি আয়মানকে মান্য করি। তাই আশা করি তাদেঁর সুবুদ্ধি হবে।
.
ফ্যাক্ট ৮: অনেকে এই চান্সে জাফর ইকবাল আর ইলিয়াস কাঞ্চনকে লুঙ্গি বেঁধে খুঁজছে। এ প্রসঙ্গে দুটা লাইন বলে রাখি।
জাফর স্যারের পেজ আছে, আইডি নাই। পেজের লেখা সপ্তাহে একবার আসে, প্রতিঘন্টায় না। আর পেজটা চালায় ওনার স্টুডেন্ট রা, স্যারের লেখা নিয়েই ছাপায় ওরা। সুতরাং বাকি কথা বুঝে নেন নয়তো মাথায় ঘিলু এড করেন।
আর কাঞ্চনের ব্যাপারে বলবো, স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি যখন থেকে “নিরাপদ সড়ক চাই” মুভমেন্ট শুরু করেন, তখন আজকের সমালোচনাকারী অনেকেই ডায়াপার পরে হাঁটতো, সুতরাং কিছু বলার আগে কাঞ্চনকে নিয়ে একটু ঘাটাঘাটি করে আসেন প্লিজ।
.
ফ্যাক্ট ৯ : জামাতিরা চান্স প্রিয়। আর বাঙালিরাও গুজবখোর। সুতরাং অলরেডি ঘোলা পানিতে ইলিশ ধরার মিশনে নেমে পড়েছে অনেক পার্টি।
“শেখ হাসিনা বলেছেন- ছাত্রদের হাফ ভাড়া দিচ্ছি আন্দোলন কেনো?”
“ছাত্রলীগ কে দায়িত্ব দিয়েছেন আন্দোলন সামলানোর।”
“ছাত্রলীগ গাড়িতে আগুন দিচ্ছে, দোষ দিচ্ছে ছাত্রদের।”
এসব নিউজ শেয়ারের আগে একটু এমবি খরচ করে ভেতরের লেখাটা পড়ে আসেন। অথবা কষ্ট করে ভ্যারিফাইড কাগজের পত্রিকা/চ্যানেলে চোখ দেন। 🙂 যে ছেলেটা আগুন দিয়েছে সে পরে নিজেই বললো বাঁচার জন্য লীগের নাম নিয়েছে। এরকম এগজাম্পল কম না। পলিটিকালি ব্যাকসাইডে থাকা স্বাধীনতাবিরোধী পার্টিগুলো আন্দোলনটাকে গোলেমালে তালগোল পাকিয়ে নিজেদের কোর্টে নিয়ে যেতে চাইবে, অলরেডি নিচ্ছেও। উদাহরণ- শিবিরের তাল বুঝে হরতাল!
.
বলছি লীগ ধোয়া তুলসিপাতা নয়, কিন্তু আপনিও তো বেকুব অন্ধ গুজব বিশ্বাসী নন!
.
সুতরাং, সাধু সাবধান!
.
ফ্যাক্ট ১০ : কেউ কি পূর্ণার কথা মনে রেখেছে? ঐ যে দীঘীনালায় যে শিশুটিকে রেপ করে মারা হলো? ক্লাস ফোরের বাচ্চা মেয়েটাকে কোপানো খুনীগুলো কই? শাস্তি চেয়ে মোমবাতি প্রজ্বলন হয়েছে, মানববন্ধনও- বাট নো মিডিয়া সাপোর্ট।
আর পায়েল? খুনীদের ধরেছে? ওয়েল। দুদিনেই জামিন তিনদিনে খালাস। ইস্যুর ভীড়ে চাপা পড়ে যাওয়া পূর্ণা কিংবা পায়েলদের কি আমরা ভুলে যাব? হয়তোবা যাব।
তনুর কথাই বা এখন আর কয়জনে বলে? 🙂
.
ফ্যাক্ট ১১ এবং সর্বশেষ ফ্যাক্ট : ছেলেমেয়েগুলো রাস্তায় নেমেছে, ট্রাফিক আটকাচ্ছে, গলা ফাটাচ্ছে, বর্ষায় ভিজে রোদে পুড়ছে। প্রশ্ন একটাই, বিচারটা কি হবে?
উত্তর – রানাপ্লাজা ০, সাগররুনি ০, নাসিরনগর ০, রামু ০, অভিজিত ০, তনু ০, বিশ্বজিৎ ০, একরাম ০, কল্পনা চাকমা ০, দীঘিনালা ০ পায়েল ০ আর কয়টা শূন্য লাগবে আপনাদের?
সুতরাং নিরাপদ সড়কের পাশেও একটা শূন্য লাগিয়ে নিন। 🙂
.
আর যদি এবার শূন্য না হয়? যদি সত্যি সত্যিই খুনীগুলোর শাস্তি হয়? (শাস্তি বলতে বিশ লাখ টাকা অনুদান বুঝাইনি কিন্তু! মানুষের প্রাণের কাছে কোটি টাকাও তুচ্ছ!!) , তবে বুঝবো পলিটিক্সের মুখে লাথি মেরে এতদিনে অবশেষে মনু্ষ্যত্ব জিতলো।
.
দুইদিনে পুরা দেশের জংধরা ট্রাফিক সিস্টেম লাইনে নিয়ে আসা ছেলেমেয়েগুলোকে স্যালুট।
.
জয় বাংলা।

লেখকঃ শত্রুঘ্ন অর্পিত

ফেসবুক পোস্ট অরিজিনাল

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.